গত ৩ মে ২০১৮ নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপের সহ ধপসভাপতি শক্তিমান চাকমাকে পরিষদের কার্যালয়ের সামনে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা এবং তারপর দিন ৪ মে তাঁর অন্তোষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে নানিয়ারচর উপজেলার বেতছড়ি নামক স্থানে চোরাগুপ্তা সশন্ত্র হামলায় সদ্য গঠিত ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর আহ্বায়ক তপনজ্যোতি চাকমা (বর্মা) সহ ৫ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা যায়। এই লোমহর্ষক ঘটনাকে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন আলোচনায় জুম্মদের মধ্যকার তথাকথিত ‘ভ্রাতৃঘাতী’ সংঘাত বলে অভিহিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আ লিক রাজনৈতিক দল বা জুম্মদের রাজনৈতিক দলগুলোর উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা চলছে। তারই সূত্র ধরে দুর্বৃত্ত ও সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করার নামে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু হয়েছে, যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভিকটিম হচ্ছে নিরীহ জুম্ম গ্রামবাসী। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার কর্মীদের টার্গেট করে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে ইতিমধ্যে অভিযোগ উঠে এসেছে।

উল্লেখ্য যে, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পরই চুক্তিকে বিরোধিতা করে ইউপিডিএফ গঠিত হয়, যেখানে দেশের একটি প্রতিবিপ্লবী গোষ্ঠী, কায়েমী শাসকশ্রেণি ও সেনাবাহিনীর একটি অংশের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ও ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। শাসকশ্রেণি ও সেনাবাহিনীর সমর্থন ও ইন্ধনের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘ভাগ করো শাসন করো’ নীতি ভিত্তিতে জুম্ম জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা, তাদের মধ্যে সংঘাত উস্কে দেয়া, সশস্ত্র গ্রুপের দোহাই দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি জায়েস করা, সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করা। বলাবাহুল্য, গঠিত হতে না হতেই ইউপিডিএফ প্রতিবিপ্লবী গোষ্ঠী ও শাসকমহলের ইন্ধনে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বকে জুম্ম জনগণের দুশমন হিসেবে অভিহিত করে তাদের উপর একের পর এক সশস্ত্র হামলা শুরু করে।

আরো উল্লেখ্য যে, ২০০৭-২০০৮ সালে দেশে জরুরী অবস্থার সময় সেনাবাহিনী সারাদেশে রাজনৈতিক সংস্কারের ধোঁয়া তুলে ‘মাইনাস টু’ (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার) ফর্মূলার মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘মাইনাস ওয়ান’ ফর্মূলা বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্র হাতে নেয়, যার মূল উদ্দেশ্য হলো জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমাকে মাইনাস করে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বকে ধ্বংস করা। তারই ফাঁদে পড়ে জনসংহতি সমিতির সুধাসিন্ধু, রূপায়ণ, চন্দ্রশেখর, তাতিন্দ্র লাল, শক্তিমান, মৃনাল কান্তি প্রমুখ চক্র সন্তু লারমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও পার্টির মধ্যে উপদলীয় চক্রান্তে লিপ্ত হয় এবং একপর্যায়ে সংস্কারপন্থী খ্যাত তথাকথিত জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা) নামে একটি দল গঠন করে। এই চক্রান্তকারীরাও দল ঘোষণা করতে না করতেই ইউপিডিএফের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বের উপর সশস্ত্র হামলা শুরু করে। তার মধ্যে অন্যতম হলো গত ২০০৯ সালে খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের সভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে নানিয়ারচরের কেঙ্গেলছড়ি নামক স্থানে (বেতছড়ির পাশে) সন্তু লারমার গাড়ি বহরের উপর সশস্ত্র হামলা করা, যেখানে চাকমা সার্কেল চীফ রাজা দেবাশীষ রায়ের গাড়িও হামলার শিকার হয়।

এভাবেই এই আত্মঘাতী সংঘাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনজীবন বিষময় হয়ে উঠে। জুম্মদের মধ্যে এই বিভাজন ও সংঘাত সফলভাবে উস্কে দিতে পেরে সরকারি বাহিনী ও শাসকশ্রেণি অনেকটা খুশীতে যারপরনাই আত্মহারা হয়ে উঠে। জাতীয় নিরাপত্তা ও অখ-তার দোহাই তুলে সরকার অস্থায়ী সেনাক্যাম্প ও সেনাশাসন প্রত্যাহারসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া একপাশে রেখে দেয়। পক্ষান্তরে চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ ও সংস্কারপন্থীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা প্রদান করতে থাকে। কিন্তু এক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের ঐকান্তিক উদ্যোগে ইউপিডিএফ ও সংস্কারপন্থীদের সাথে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য জনসংহতি সমিতির এক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে একসময় এই আত্মঘাতী সংঘাত ও হানাহানি ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে। বিশেষ করে ২০১৫ সাল থেকে এই সংঘাত কার্যত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়।

জুম্মদের এই সংঘাত ও হানাহানি বন্ধ হওয়াতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও শাসকশ্রেণির কায়েমী গোষ্ঠীর ঘুম হারাম হয়ে যায়। তাদের ‘ভাগ করো শাসন করো’ নীতির এজে-া নস্যাৎ হতে দেখে তারা অস্থির হয়ে উঠে। অস্বস্তিতে তারা ছটফট করতে থাকে। জুম্মদের মধ্যেকীভাবে এই আত্মঘাতী সংঘাত নতুন করে শুরু করা যায় তার জন্য তারা নতুন নতুন ষড়যন্ত্র খুঁজতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা সংস্কারপন্থীদের যোগসাজশে এক নতুন ষড়যন্ত্রের বীজ খুঁজে পায়। আর সেটা হলো ইউপিডিএফ থেকে নিষ্ক্রিয় বা বহিষ্কৃত কতিপয় ব্যক্তিদের নিয়ে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে একটি দল গড়ে তোলা। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সংস্কারপন্থীদের প্রত্যক্ষ মদদে ও সমর্থনে গত ১৫ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে খাগড়াছড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তপন জ্যোতি চাকমা (বর্মা)-কে আহ্বায়ক ও জোলেয়া চাকমা (তরু)-কে সদস্য সচিব করে এ দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। আত্মপ্রকাশ হতে না হতেই তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক ইউপিডিএফ সদস্য ও সমর্থকসহ নিরীহ মানুষকে হত্যা, অপহরণ, মারধর ও মুক্তিপণ আদায় করার অভিযোগ উঠতে থাকে।

এসব অভিযোগের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- (১) ৫ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে নানিয়ারচরে সাবেক ইউপি মেম্বার অনাদি রঞ্জন চাকমাকে গুলি করে হত্যা; (২) ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে বন্দুকভাঙ্গায় অনল বিকাশ চাকমা ওরফে প্লটোকে হত্যা; (৩) ৫ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে খাগড়াছড়িতে মিঠুন চাকমাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে হত্যা; (৪) ১৭ মার্চ ২০১৮ তারিখে রাঙ্গামাটি থেকে হিল উইমেন ফেডারেশনের মন্টি চাকমা ও দয়াসনা চাকমাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ; (৫) ১১ এপ্রিল ২০১৮ বেতছড়িতে সুনীল তঞ্চঙ্গা জনিকে হত্যা; (৬) ১৬ এপ্রিল ২০১৮ খাগড়াছড়ি সূর্য বিকাশ চাকমাকে হত্যা; (৭) ২২ এপ্রিল ২০১৮ পানছড়িতে সুনীল বিকাশ ত্রিপুরাকে হত্যা।

আরো উল্লেখ্য যে, গত ২১ মার্চ ২০১৮ খাগড়াছড়ি জেলার মিলনপুর গ্রামে সংস্কারপন্থী সদস্য সুদর্শন চাকমার বাড়িতে খাগড়াছড়ি নিরাপত্তা বাহিনীর জনৈক মেজর, সংস্কারপন্থী জেএসএসের সাধারণ সম্পাদক তাতিন্দ্র লাল চাকমা, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, মহালছড়ি সশস্ত্র গ্রুপের নেতা প্রজ্ঞান চাকমা এক মিটিং-এ মিলিত হয়েছে বলে জানা যায়। সেখানে তারা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও তবে সংঘাত চালিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করে থাকতে পারে বলে অনেকে অভিমত দিয়েছেন।

এমনিতর খুন-খারাবিতে গত ৩ ও ৪ মে ২০১৮ প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলায় শক্তিমান চাকমা ও তপনজ্যোতি চাকমা (বর্মা) সহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়। সংস্কারপন্থী ও গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ এসব ঘটনার জন্য প্রসিত নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফকে দায়ী করে। এই দু’টি ঘটনায় সংস্কারপন্থীর সদস্য রূপম দেওয়ান কর্তৃক ৪৬ জন ইউপিডিএফ সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে এবং গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ-এর সমস্য নীতিপূর্ণ চাকমা অর্চিন কর্তৃক ৭২ জন ইউপিডিএফ সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে নানিয়ারচর থানায় দু’টি মামলা দায়ের করা হয়।

ঘটনা ও ষড়যন্ত্র এখানেই শেষ নয়। ছয়জন হত্যার ঘটনার সাথে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বকে জড়িত করার জন্য নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃত্ব মরিয়া হয়ে উঠে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সৃষ্ট অনলাইন পত্রিকা ও হলুদ সাংবাদিকদের দিয়ে কল্পনাপ্রসূত যুক্তি ও বানোয়াট কাহিনী উপস্থাপন করে অপপ্রচার করতে থাকে যে, এ ঘটনার সাথে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে জনসংহতি সমিতি জড়িত। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক পূর্তিতে গত ২রা ডিসেম্বরে জনসংহতি সমিতি সভাপতি সন্তু লারমার দেয়া বক্তব্য “পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হলে পাহাড়ে আগুন জ্বলবে” এই বক্তব্যকে উদ্ধৃতি দিতে থাকে এবং শক্তিমান ও তপনজ্যোতি হত্যাকা-ের ঘটনা শ্রী লারমার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সংঘটিত হয়েছে বলে কল্পনাপ্রসূত যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করতে থাকে।

শুধু তাই নয়, শক্তিমান ও তপনজ্যোতি হত্যাকা-ের ঘটনায় মামলা করার সময় উক্ত দু’টি মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রাঙ্গামাটির গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী, আওয়ামী লীগের রাঙ্গামাটি জেলা নেতৃত্ব থেকে জনসংহতি সমিতির সদস্য ও সমর্থক ৪০/৫০ জনের নাম সরবরাহ করা হয় বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়। জনসংহতি সমিতির উক্ত সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার জন্য তপন জ্যোতি চাকমার স্ত্রী, অর্চিন চাকমা ও রূপম দেওয়ানের উপর প্রচ্ছন্ন চাপ দেয়া হয় বলে জানা যায়। তবে সর্বশেষ তাদের সেই ষড়যন্ত্র সফল হতে পারেনি।

তবে উক্ত ষড়যন্ত্র সফল না হলেও উক্ত ঘটনার পর সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর চলমান অভিযানে জনসংহতি সমিতির সদস্য ও সমর্থকদের বিশেষভাবে টার্গেট করে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে। যেমন- গত ৯ মে ২০১৮ সকালে জনসংহতি সমিতির বাঘাইছড়ি থানা শাখার সভাপতি প্রভাত কুমার চাকমা মারিশ্যা বাজারে গেলে যৌথবাহিনী তাকে আটক করে এবং পরে নানামুখী চাপের ফলে রাত ১০টা পর্যন্ত থানা থেকে ছেড়ে দেয়।১১ মে ২০১৮ ভোর ৩:৩০ ঘটিকায় রাঙ্গামাটির কল্যাণপুর থেকে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের স্টাফ সদস্য সুঅতীশ চাকমা তন্টুমণিকে আটক করা হয়। বর্তমানে রাঙ্গামাটি শহরে বিভিন্ন এলাকায় চেক বসিয়ে যত্রতত্র ব্যাপকভাবে যানবাহন চেক করা হচ্ছে এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী অভিযান নানিয়ারচর উপজেলা, রাঙ্গামাটি সদর, বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলায় চলছে। এতে করে জনমনে চরম আতঙ্ক ও ভীতি দেখা দিয়েছে। আ লিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানের পক্ষে মিডিয়া কভারেজের জন্য ছয় হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পরে নিরাপত্তা বাহিনী রাঙ্গামাটিতে স্থানীয় সাংবাদিকদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভাও আয়োজন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পূর্বের ঘটনাগুলোর মতো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী স্থানীয় নেতৃত্ব জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নানিয়ারচরে সংঘটিত ছয় হত্যাকা-ের ঘটনাকেও রাজনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করতে সক্রিয় হয়ে উঠে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত জনসংহতি সমিতির নেতৃত্ব যাতে অবাধে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে না পারে তার জন্য এ ঘটনার সুযোগে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে দিয়ে জনসংহতি সমিতির সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রদান করা, গ্রেফতার করা, জেল-হাজতে প্রেরণ করা, এলাকাছাড়া করা, যৌথবাহিনীর অভিযানে তাদেরকে টার্গেট করা ও ঘরবাড়ি তল্লাসী চালানোর ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করে বলে জানা যায়। তারই অংশ হিসেবে ১৩ মে ২০১৮ রাঙ্গামাটিতে সম্মিলিত নাগরিক সমাজের নামে দীপংকর তালুকদারের নেতৃত্বে “স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই” শ্লোগানকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের এক সমাবেশ আয়োজন করা হয়। কোন ঘটনা ঘটলেই সেই ঘটনায় জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে জড়িত করার ষড়যন্ত্র চালাতে তিন পার্বত্য জেলায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে যত না দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে সরব হতে বিন্দুমাত্র দেখা যায়নি। চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে কখনো কোন কর্মসূচি ঘোষণা করতে তাদেরকে লক্ষ করা যায়নি। বর চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতে সর্বদা দেখা যায়।

অপরদিকে নিজেদের অপকর্ম ধামাচাপা দিতে সংস্কারপন্থীরাও শক্তিমান চাকমাকে হত্যার ঘটনার সাথে জনসংহতি সমিতিকে প্রকারান্তরে দায়ী করে বিবৃতি দেয়। ১২ মে ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত ‘কেন খুন করা হলো শক্তিমান চাকমাকে’ শীর্ষক এক বিবৃতিতে সংস্কারপন্থীরা ইউপিডিএফ ও জনসংহতি সমিতি “একত্রে মিলে এই খাগড়াছড়ির জেএসএসকে (সংস্কারপন্থীদেরকে) নির্মূল করা হবে” মর্মে সমঝোতা হওয়ার এক অপপ্রচারণাকে তুলে ধরে এবং উক্ত সমঝোতার এক মাসের মাথায় শক্তিমানকে খুন করা হয়েছে বলে দাবি করে। তাদের নিজেদের চক্রান্তের দায় বরাবরেই মতো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সন্তু লারমার উপর চাপিয়ে দিতে সংস্কারপন্থীদের বিবৃতিতে আরো বলা হয় যে, “আজ যদি নতুন করে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বাঁধে, তাহলে সে দায় সন্তু লারমাকেই নিতে হবে”।এমনকি পূর্বের মতো উক্ত বিবৃতিতে সংস্কারপন্থীরা “সন্তু লারমা নীতিচ্যুত হতে পারেন, ডিগবাজী খেতে পারেন” বলে বিষোদগার করে আরেকবার তাদের অপরিণামদর্শী রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরে।

পূর্বের আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, সংঘাতময় আত্মঘাতী অবস্থা থেকে শান্ত হয়ে যাওয়া আপাত পরিস্থিতিকে সংস্কারপন্থীরাই আবার অশান্ত তুলেছে। আপাত বন্ধ হওয়া আত্মঘাতী সংঘাত ও হানাহানিকে তারাই নতুন করে উস্কে দিয়েছে। তারাই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সাথে গাঁটছড়া বেঁধে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দিয়ে এই সংঘাত শুরু করেছে। আর তারাই কিনা চোরের মায়ের বড় গলা-এর মতো সংঘাতের বিরুদ্ধে বড় আওয়াজ তুলছে এবং ‘ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ করে জাতীয় বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলবো’ বলে গালভরা বুলি আওড়াচ্ছে। আর এজন্য জনসংহতি সমিতির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে নিজেদের রাজনৈতিক দেউয়ালীপনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। এ থেকে বুঝা যায়, শাসকশ্রেণির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে যে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের মধ্য দিয়ে সংস্কারপন্থীদের জন্ম হয়েছে সেই বিভেদপন্থা, চক্রান্তকারিতা ও ষড়যন্ত্রকামিতা থেকে এখনো তারা বেরিয়ে আসতে পারেনি।

সংস্কারপন্থীদের বিবৃতিতে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে সরকারের অব্যাহত গড়িমসি ও তালবাহানা নিয়ে কোথাও কোন বক্তব্য নেই, অথচ বিৃবতিতে বড় গলায় বলছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন থেকে এক কদমও পিছিয়ে যাবো না।’ বিবৃতিতে নানিয়ারচর ব্রিজ-এর জন্য শক্তিমান চাকমাকে অনেকটা রূপাকারের মতো উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে এ ধরনের ব্রিজ নানিয়ারচরবাসীর মরণ ফাঁদে পরিণত হবে তা বিশ্লেষণ করার ন্যূনতম রাজনৈতিক প্রজ্ঞাও তাদের মধ্যে চরম অনুপস্থিত বলে প্রতীয়মান হয়। এই ব্রিজ ধরে নানিয়ারচর থেকে ডাকঘর মোন হয়ে লংগদু পর্যন্ত যে রাস্তা নির্মাণের সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে তা বাস্তবায়িত হলেও একদিকে যেমন ব্যাপক হারে সেটেলার অনুপ্রবেশ ঘটবে ও অপরদিকে তেমনি জুম্মরা উচ্ছেদের কবলে পড়বে তা বলাই বাহুল্য।

নানিয়ারচরের ছয় হত্যাকান্ডের পর শাসকশ্রেণি, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনী, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃত্ব যেভাবে ষড়যন্ত্রমূলক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে এবং শত শত জওয়ান জড়ো করে জেলাব্যাপী যৌথ বাহিনীর ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে তা নজীববিহীন। তা থেকে বুঝা যায় এই হত্যাকান্ডে নিহত শক্তিমান চাকমা ও তপনজ্যোতি চাকমা ছিলেন তাদের খাস লোক। খুব কাছের এই খাস লোককে হারিয়ে কার রাগ কার উপর ফেলবে সেটা নিয়ে তারা অস্থির হয়ে পড়েছে। ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে অন্যের উপর, বিশেষ করে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বের উপর দায় চাপানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এর আগে তাদেরই উস্কানীতে আত্মঘাতী সংঘাতে শত শত লোক মারা গেছে। কিন্তু তাদের কোন কিছুই আসে যায়নি। বর তারা হয় নির্বিকার থেকেছিল, না হয় লোক দেখানো বিবৃতি দিয়ে ক্ষান্ত ছিল। নির্লিপ্ত থেকে, দায়মুক্তি দিয়ে প্রাকারান্তরে অবাধে অপকর্ম চালিয়ে যেতে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে প্রতীয়মান হয়েছিল।

নানিয়ারচরে ছয় হত্যাকা-ে যেভাবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সরব হতে দেখা গেছে কিংবা দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করার নামে তারা যেভাবে তড়িৎ অভিযানের উদ্যোগ নিয়েছেন, সেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়গুলো বাস্তবায়নে যদি উচ্চ পর্যায় তৎপর হতো কিংবা নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনী, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতৃত্ব ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতো তাহলে অনেক আগেই চুক্তির সব বিষয় বাস্তবায়িত হয়ে যেতো। পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক যদি সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদিসহ সকল ক্ষমতা ও কার্যাবলী পার্বত্য চট্টগ্রাম আ লিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তর করা হতো; যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধ্যুষিত অ লের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের আইনী ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হতো; যদি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করে জুম্মদের বেহাত হওয়া জায়গা-জমি ফেরত দেয়া হতো; যদি সেনাশাসনসহ সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হতো; যদি স্ব স্ব জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ পূর্বক প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্ত পুনর্বাসন করা হতো; যদি অস্থানীয়দের নিকট দেয়া লীজ বাতিল করে যদি জুম ভূমি ও মৌজা ভূমি পুনর্বহাল করা হতো এবং প্রত্যেক ভূমিহীন পাহাড়ি পরিবারকে দুই একর করে ভূমি বন্দোবস্তী দেয়া হতো; যদি পার্বত্যা লের সকল চাকরিতে জুম্মদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগের ব্যবস্থা পূর্বক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হতো; যদি সেটেলার বাঙালিদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন করা হতো; তাহলে এই ধরনের আত্মঘাতী সংঘাত ও হানাহানি অনেক আগেই বন্ধ হয়ে যেতো বলে অনেকে জোরালো অভিমত তুলে ধরেছেন।

বস্তুত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্যেই এ ধরনের সংঘাত ও হানাহানি অবসানের উপায় নিহিত রয়েছে। যৌথ বাহিনীর নিবিঢ় অভিযান চালিয়ে এ ধরনের সশস্ত্র সংঘাত বা তৎপরতা হয়তো সাময়িক বন্ধ করা যাবে, কিন্তু স্থায়ীভাবে নিরসন করা যাবে না। পার্বত্য চুক্তির উল্লেখিত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান দিতে পারলেই তবে এই ধরনের সংঘাত ও তৎপরতা বন্ধ হতে পারে। তাই সরকারকে যৌথ বাহিনীর অভিযান চালিয়ে দমন-পীড়নের পরিবর্তে স্থায়ী সমাধানের স্বার্থে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সমাধনের পথে এগিয়ে আসতে হবে, সেটাই পার্বত্যবাসী প্রত্যাশা করে।


উদয়ন তঞ্চঙ্গা
মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক