বর্ষবিদায় ও বর্ষ বরণে মেতে উঠেছে পাহাড়। পুরনোকে ধুয়ে মুছে নতুনের অবগাহন। পাহাড়ের জুম্ম জনগণের প্রাণের উৎসব ভিন্ন ভিন্ন জাতির ভিন্ন ভিন্ন নাম। সাংগ্রাইং, বিহু, বিষু, বৈসুক, বিজু যে নামেই ডাকিনা কেন মূল সুর বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ। বঙ্গাব্দ ও মগাব্দ-কে ঘিরে জুম্ম জনগণের এই উৎসব। যখন লেখাটি লিখছি তখন উৎসব শুরু হয়ে গেছে। নদীতে ফুল ভাসানো, বাড়ীর দুয়ারে দুয়ারে শোভিত হচ্ছে ফুলের মালা, বিকেলে নদীর ঘাটে, বাড়ীর উঠানে জ্বলবে সন্ধ্যা প্রদীপ। শুরু হবে বিজুর খাওয়া দাওয়া এ ঘর থেকে ও ঘর বেড়ানো। মগাব্দকে ঘিরে যাদের উৎসব তারাও জলকেলীর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এটাইতো উৎসবের চিরায়ত নিয়ম। কিন্তু উৎসবের এই চিরায়ত নিয়মের সাথে আরও কিছু নিয়ম আমাদের সমাজ জীবনকে প্রভাবিত করে। প্রশ্নটা আসে জুম্ম জনগণের বর্তমান যে জীবন তাকি সত্যিই জীবন? পাহাড়ী মানুষ যে জীবন পেতে চেয়েছিল এই জীবন কি সেই জীবন? এই ধরণের হরেক রকমের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে উৎসব আসে আবার চলেও যায়।
ক্রমান্বয়ে নিজ ভূমে পরবাসী হওয়া জুম্ম জনগণের অনিশ্চিত জীবনের সাথে উৎসবটাও অনেক সময় অনিশ্চিত হয়ে যায়। কিংবা যে টুকু রঙিন হওয়ার কথা সেই টুকু হয়ে উঠে না। মধ্য এপ্রিলের এই সময়ে অনেক পাহাড়ী জনপদে খাদ্যাভাব থাকে। চাকমারা বলে চৌইত মাইস্যা রাদ। জুমের ফসল ঘরে না উঠা পর্যন্ত জুম চাষ নির্ভর পরিবারগুলো অভাব অনটনে থাকে। কিন্তু এই অভাব অনটন মাঝে মাঝে প্রকট আকার ধারণ করে বসে। সাজেকের দূরবর্তী গ্রাম কিংবা থানছির দূরবর্র্তী অঞ্চল সেই সাথে ফারুয়ার জনপদগুলিতে অনেকটা অভাবি অবস্থা বিরাজ করে এই সময়টাতে।
যারা শহরে কিংবা জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন সদরে থাকেন বা গ্রামে একটু স্বচ্ছল জীবন যাপন করেন তাদের উৎসবও কি নিরাপদ থাকে? মধ্যবিত্তের জীবন টানা-টানির সাথে চাকুরীর বোনাস নিয়ে যারা উৎসবে মাতেন সেখানেও কি প্রাণের ছোঁয়া থাকে?
কিন্তু জীবন বলে কথা। জীবন জীবনের নিয়মে না চললেও উৎসবে তো আর বৈরাগ্য সাধন করা যায়না। জুম্ম জনগণ তাদের জীবন মিলাতে না পারলেও এই উৎসব তো আর নিছক উৎসব নয়। এতো আমার পরিচয়। আমার স্বকীয়তা। যে আত্মপরিচয় আর স্বকীয়তার জন্য আমরা লড়ছি নিরন্তর। বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের যে ঐতিহ্য সেতো আমাদের ভিন্নতার ঐতিহ্য। আমাদের জীবনের শেকড়।
লংগদুর পোড়া জনপদে হয়তোবা উৎসব সেভাবে আসে না। পোড়া বসতীর সামনে কি আর আনন্দে মাতোয়ারা হওয়া যায়। খাদ্য সংকটে অভাব অনটনে জর্জরিত সেই পাহাড়ী জনপদে উৎসব বিবর্ণ হয়ে যায়। বিজুর বাঁশীর সুর অভাবী পেটে সুমুধুর হওয়ার কথা নয়। জলকেলীর আনন্দও তাদের উপোসী জীবনকে রাঙাতে পারেনা। তারপরেও কিশোর-কিশোরীরা বুনো ফুলতো ছড়াতে ভাসাবে। কিছুই না হোক পাজন টাতো থাকবে। জলকেলী হয়তো হলোনা বয়স্কদের স্নান করিয়ে কিংবা প্রণাম করে হলেতো মনটা একটু ফুরফুরে হবে।
জীবন এখনও আমাদের হয়নি। সেটা আমরা জানি। অনেকে আবার সেটা ভুলে যেতে চায়। ভুলে যেতে চাইলেও রাষ্ট্র স্মরণ করাতে দ্বিধা করে না। লংগদুর মতো ঘটনা ঘটিয়ে বারংবার মনে করিয়ে জীবন এখনও জুম্ম জনগণের নয়। কিংবা ফারুয়ার সেই নির্যাতিত কিশোরীদের মুখইতো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি। এই মুখায়ব নিয়েতো আবার বর্ষবিদায় ও বর্ষববরণে মেতে উঠে পাহাড়ের মানুষ। সেটাও তার নিজের জীবনের জন্য। যত না উৎসব তার চেয়ে বড় হচ্ছে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য। জাতীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বর্ষবিদায় ও বর্ষববরণে জুম্ম জনগণ নিজের জীবনকে খুঁজে পেতে চেষ্টা করে। বেদনার মাঝেও. জীবন আমাদের না হওয়ার পরেও নতুন জীবন সন্ধানের জন্য জীবনের জয়গান গাইতেই হবে।
১২ এপ্রিল ২০১৮, ফুল বিজু রাঙামাটি।
………………………….
দীপায়ন খীসা,তথ্য ও প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম