ভূমিকা
বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সমতল অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসী মানুষের বসবাস। বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ, বৃহত্তর সিলেট, গাজীপুর, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, বরগুনা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল প্রভৃতি অঞ্চলে আদিবাসীদের বাস। বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র ও অনগ্রসর অংশের মধ্যে অন্যতম আদিবাসী জনগণ। সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উভয় অঞ্চলের আদিবাসীদের সিংহভাগ এখনও জীবিকা নির্বাহের জন্য ভূমি ও বনের ওপর নির্ভরশীল। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে আদিবাসীরা সাঁওতাল হুল ও মুন্ডা বিদ্রোহের মতো সংগ্রামে সামিল হয়েছিলেন তাদের স্বাধিকার রক্ষা ও ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশে আজো তারা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত আছেন। বিষয়বস্তুর প্রেক্ষাপট হিসেবে আমরা দেখি বহু জাতির মানুষের দেশ বাংলাদেশের সংবিধানে বাঙালির বাইরে অন্যান্য জাতির অস্তিত্ব তেমনভাবে স্বীকার করা হয়নি। তবে পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ২৩ (ক) ধারায় দেশের জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বলা হয়, “রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।” তার মানে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘নৃ-গোষ্ঠী’ বা ‘সম্প্রদায়’ যে নামে ডাকা হোক, এটা সাংবিধানিকভাবে প্রমানিত যে বাংলাদেশ একক জাতিসত্তার রাষ্ট্র নয়।
বহু বছর ধরে আদিবাসী সংগঠনসমূহ তাদের ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। সরকারসমূহও অনেকবার সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বর্তমান সরকার সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ২০০৮ সালে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮ অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, আদিবাসী ও চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চির অবসান, তাদের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম, মানমর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনি অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার অবসান করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের জন্য চাকরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। অনগ্রসর অঞ্চলসমূহের উন্নয়নে বর্ধিত উদ্যোগ, ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী, আদিবাসী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।’
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
২০০৭ সালের১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র গৃহিত হয়। এতে আদিবাসীদের মানবাধিকার, ন্যায্যতা ও উন্নয়নের পথ খুলে যায়। আদিবাসী ঘোষণাপত্রের ৪৬টি ধারার ১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত যেভাবেই হোক আদিবাসীরা জাতিসংঘ সনদ, সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনসমূহে বর্ণিত সকল অধিকার ভোগ করবে। ঘোষণাপত্রের ৩ নম্বর ধারায় বলা আছে, আদিবাসীদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অধিকার রয়েছে। এ অধিকারের বলে তারা স্বাধীনভাবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারে এবং স্বাধীনভাবে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে। ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, আদিবাসীদের জোর করে তাদের এলাকা বা ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। তা ছাড়াও আদিবাসীদের মাতৃভাষায় পড়াশোনার সাথে সাথে নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও নিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথাও ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে।
ঘোষণাপত্রের ২৬ ধারায় বলা হয়েছে, যে সব ভূমি, এলাকা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আদিবাসীরা বংশপরম্পরায় ঐতিহ্যগতভাবে ভোগদখল করে আসছে বা কোনরকম ব্যবহার করে আসছে, তার উপর আদিবাসীদের অধিকার রয়েছে। আবার বলা হয়েছে, রাষ্ট্র এ সব ভূমি, অঞ্চল ও সম্পদের আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করবে এবং এ ধরনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে আদিবাসীদের রীতিনীতি, ঐতিহ্য ও ভূমি মালিকানা প্রথাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ র‌্যাটিফাই করেন। এই কনভেনশনে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির মালিকানা ও অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু এই কনভেনশনের আলোকে জাতীয় পর্যায়ে আইন বা নীতিমালা হয়নি এখনো। বঙ্গবন্ধু র‌্যাটিফাই করে গেছেন। বাকীরা পরের কাজগুলো করেননি। এ কনভেনশনের মূল কথা, আদিবাসীদের কাগজ বা দলিল থাকুক বা না থাকুক, যে জমি ঐতিহ্যগতভাবে ওরা ব্যবহার করে, সে জমি তাদের। আইএলও কনভেনশনের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ঐতিহ্যগতভাবে অধিকৃত ভূমির উপর যৌথ কিংবা ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার স্বীকার করতে হবে।” আন্তর্জাতিক সনদের বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং এসবের আলোকে আইন না থাকায় আদিবাসীরা তাদের ভূমি রক্ষা করতে পারছে না। এখন সময় এসেছে আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ অনুস্বাক্ষর করার।
আদিবাসী ইস্যুতে পৃথিবীর অনেক দেশ
আদিবাসী ইস্যুতে পৃথিবীর অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নরওয়েসহ স্ক্যানডিনেভিয়ান কয়েকটি দেশে আদিবাসী সামি পার্লামেন্ট আছে। নেপালের কনস্টিটিউশন এসেম্বলিতে জনজাতিদের বড় ভূমিকা ছিল এবং ওদের সংসদের স্পীকার ছিলেন লিমবু আদিবাসী। এক সময় ভারতের স্পীকার ছিলেন মেঘালয়ের একজন গারো। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, জাপান, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম এরকম আরো অনেক দেশ চেষ্টা করছে আদিবাসীদের অধিকার প্রদানের। অস্ট্রেলিয়া সরকার অতীতের ভুল আচরণের জন্য পার্লামেন্টে আদিবাসীদের কাছে ঐতিহাসিক ক্ষমা চেয়ে বলেছে, ‘এই ক্ষমা প্রার্থনা ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে আমরা একে অপরের যাতনা বুঝতে পারবো এবং সামনে অগ্রসর হতে পারবো।’ দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। আইএলও কনভেনশন র‌্যাটিফাইয়ের বেলায়ও তারা শীর্ষে। স্বশাসনের সবচেয়ে ভালো নমুনা হলো নর্থ ইস্টসহ ভারতের আদিবাসী অঞ্চলগুলো।
বাংলাদেশে আদিবাসীদের জীবনে মূল অবলম্বন হলো ভূমি
বাংলাদেশে আদিবাসীদের জীবনে মূল অবলম্বন হলো ভূমি। অথচ যুগ যুগ ধরে আদিবাসীরা তাদের ভূমি হারিয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের কারণেও যেমন বাঁধ নির্মান (কাপ্তাই), ন্যাশনাল পার্ক, ইকো-পার্ক, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বাঁধ, সামাজিক বনায়ন, মিলিটারী বেইস নির্মান ইত্যাদির কারণে আদিবাসীরা ভূমি হারাচ্ছে। ইকো-পার্ক প্রকল্পের ফলে খাসিয়া (নিজেরা খাসি বলেন) ও গারোরা উচ্ছেদ হতে বসেছিল। পরে আদিবাসীদের আন্দোলনের ফলে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু মধুপুরে আদিবাসীদের জীবন দিতে হয়েছে। এর কোনো বিচারও হয়নি। অন্যদিকে, প্রভাবশালী শক্তিমান ভূমিগ্রাসী চক্র ক্রমাগতভাবে আদিবাসীদের জমিজমা কেড়ে নিয়েছে জোর করে। জাল দলিল দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে, আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে, নানারকম মামলা দিয়ে স্বর্বশান্ত করেছে আদিবাসীদের। দেশান্তরী হওয়ার কারণেও আদিবাসীরা অনেক জমিজমা হারিয়েছে। তাদের জমি শত্রু সম্পত্তি বা অর্পিত সম্পত্তি হয়ে গেছে। আদিবাসীরা হয়তো কখনও কখনও আইনের আশ্রয় নিয়েছে, মামলা করেছে, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মামলা চালাতে গিয়ে আরও নিঃস্ব হয়েছে। বছরের পর বছর আদিবাসীরা মামলা করে জমি ফেরত পেয়েছে, এ রকম নজির বলতে গেলে খুব একটা নেই।
শুধু ভূমিলোভী চক্র নয়, বা কখনও কখনও বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে শুধু নয়, ‘পপুলেশন ট্রান্সফার’-এর কারণে আদিবাসীদের জায়গা-জমি অন্যের দখলে চলে গেছে। খাসি পাহাড়ে বা মধুপুর বনে আদিবাসীরা বনবিভাগের সামাজিক বনায়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করে বা এই ধরনের প্রকল্প চায় না, কারণ তাতে দীর্ঘদিন ধরে যে ভূমিতে তারা ঐতিহ্যগতভাবে বসবাস করছে, ভূমি ব্যবহার করছে, তার মালিকানা নিয়ে সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষত ভূমিতে দখলিসত্ত্ব নিয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে, এ ভয়ে ও অনিশ্চয়তায়। যে ভূমিকে আদিবাসীরা মনে করতো তাদের অস্তিত্বের চিহ্ন, এখন সেই ভূমির অধিকার দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। যে বনকে তারা মনে করতো নিজেদের, সেই বনের উপর তাদের অধিকার তো অস্বীকার করা হচ্ছে। আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ এর দ্বিতীয় অংশের ১২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কারণে দেশের আইন এবং বিধি ব্যতিরেকে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে তাদের আবাসভূমি থেকে তাদের স্বাধীন সম্মতি ছাড়া বাস্তুচ্যুত করা যাবে না।” কখনো যদি বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে আদিবাসীদের সরানোর প্রয়োজন হয়, তখন তাদের সম্মতিতে পূর্ণ নিশ্চয়তাসহ ক্ষতিপূরণ প্রদানের কথা বলা হয়েছে, সেটি হতে হবে ভালো মানের জমি বা নগদ অর্থ দিয়ে।
অনুচ্ছেদ ১৩ বলছে, “সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সদস্য নয় এমন ব্যক্তিদেরকে এসব প্রথার সুযোগ গ্রহণ অথবা এসব জনগোষ্ঠীর সদস্যদের আইন সম্পর্কিত অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জমির মালিকানা লাভ কিংবা ব্যবহার করা থেকে নিবৃত্ত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”এই কনভেনশনে সরকারকে আদিবাসীদের ভূমি রক্ষায় এবং ভূমি সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় বিধি এবং নীতিমালা তৈরি করতে বলা হয়েছে। তাছাড়া বঙ্গীয় প্রজাসত্ব আইনে আদিবাসীদের ভূমি অ-আদিবাসীদের নিকট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিমালা থাকার পরও আদিবাসীরা ভূমি হারাচ্ছে। কারণ আইন যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না এবং এ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নেই। তাই সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। আদিবাসীদের ভূমি বিদ্যমান প্রচলিত আইন দিয়ে ভূমিদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না, এটি এখন সবাই স্বীকার করেন।
কেন সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন দরকার
যেহেতু,বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমতল অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে ও এলাকানির্ভর সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র, প্রান্তিক, অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত আদিবাসী মানুষের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন আবশ্যক ; এবং
যেহেতু,বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমতল অঞ্চলে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসী মানুষের বসবাস বিধায় দেশের মূল¯্রােতের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে, বার্ষিক বাজেটে ন্যায় সংগত আর্থিক বরাদ্দ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে জাতীয়ভাবে ব্যাপকভিত্তিক অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততা প্রয়োজন ; এবং
যেহেতু, এ অঞ্চলের বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক উৎপীড়ন, নির্যাতন, উচ্ছেদ, অগ্নি সংযোগ ও দমন-পীড়নের ফলে এ অঞ্চলের জন-অধ্যুষিত আদিবাসী জনগোষ্ঠী দেশান্তরিত হয়ে নিঃস¦, বাস্তুচ্যূত, ভূমিহীন ও অধিকারহারা হেতু তাদের প্রতি বিশেষ মানবিক, আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক ; এবং
যেহেতু, এ অঞ্চলের বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে উদ্বাস্তু হওয়ার ফলে পরবর্তীতে প্রণীত কতিপয় বিশেষ আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিগৃহীত, বঞ্চনা ও অধিকারহারা হেতু প্রশাসনিক বিশেষ সহযোগিতা ও ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত আবশ্যক ; এবং
যেহেতু, এ অঞ্চলের কতিপয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী বনের বাসিন্দা কোন কোন ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত বন আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের নিজেদের প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত ভূমি মালিকানা, দখল এবং দলিলগত জ্ঞানের অপ্রতুলতা হেতু আইনগত বিশেষ সহায়তা প্রদান ও অভিজ্ঞান জরুরি প্রয়োজন ; এবং
যেহেতু, এ অঞ্চলের বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের মহান মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহন করে শহীদ হয়েছেন এবং শত শত মানুষ দেশত্যাগ ও বঞ্চনার স্বীকার হয়েছেন হেতু তাঁদের পুনর্বাসন ও জীবনমান উন্নয়ন সাধন করা একান্ত আবশ্যক ; এবং
যেহেতু, এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ সমতল এলাকায় বসবাসরত বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ অপরাপর সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন ; এবং
যেহেতু, এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ সমতল এলাকায় বসবাসরত বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমুহের মধ্যে বিরাজমান ভূমি, বন, জলাভূমি, দলিলাদি ও এ সংক্রান্ত উদ্ভুত মামলা-মোকদ্দমার ফলে তাদের ভূমি হারিয়ে যাচ্ছে তাই ভূমি রক্ষার জন্য ও বিরোধের দ্্রুত ও ন্যায্য নিষ্পত্তির জন্য একটি কমিশন গঠন ও আনুষাঙ্গিক বিধি বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়।
সংক্ষিপ্ত শিরোনাম ও প্রবর্তন । –
(১) এই আইন বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কমিশন আইন নামে অভিহিত হইবে ।
(২) সরকার এই আইন যে তারিখে গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশ করিবে সেই তারিখ হইতে এই আইন কার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে ।
২ ।সংজ্ঞা । – বিষয় বা প্রসঙ্গের পরিপন্থি কোন কিছু না থাকিলে, এই আইনে –
(ক)‘কমিশন’ অর্থ ধারা ৩ এর অধীন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে বসবাসরত বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি [বিরোধ নিষ্পত্তি] কমিশন;
(খ)‘চেয়ারম্যান’ অর্থ কমিশনের চেয়ারম্যান এবং চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কোন সদস্যও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবেন;
(গ)‘সদস্য-সচিব’ অর্থ এই কমিশনের সার্বক্ষনিক সদস্য-সচিব;
(ঘ)‘সদস্য’ অর্থ এই কমিশনের সদস্য;
(ঙ)‘সমতল অঞ্চল’ অর্থ বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের তিনটি জেলাসমূহ, যথা – বান্দরবান পার্বত্য জেলা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা ব্যতীত দেশের অন্য সমস্ত অঞ্চলই এই আইনের ক্ষেত্রে সমতল অঞ্চল বলিয়া পরিগণিত হইবে;
(চ)‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী’ অর্থ সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী বাংলাদেশের বৃহত্তম মোট ৪৯ টি (উনপঞ্চাশ) জনজাতিদের বুঝাইবে, যাঁদের সরকার প্রদত্ত গেজেটেড তালিকা তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে;
(ছ)‘ভূমি’ অর্থ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ সালের ধারা ২ (১৬) (১৬ক) এ সংজ্ঞায়িত ভূমিকেই বুঝাইবে;
(জ)‘বন’ বা ‘বনভূমি’ অর্থ বন আইন, ১৯২৭ এর আওতাভুক্ত ভূমিকেই বুঝাইবে;
(ঝ)‘বিরোধ’ অর্থ সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবসীদের মধ্যে দীর্ঘ ও বিরাজমান ভূমি, বন, দলিলাদি, রেকর্ড ও বনভূমি সম্পর্কিত কাগজপত্র এবং এ সংক্রান্ত উদ্ভুত মামলা-মোকদ্দমা বিরোধকে বুঝাইবে;
(ঞ)‘প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত ভূমি মালিকানা’ অর্থ এ অঞ্চলের আদিবাসীরা প্রাগৈতিহাসিক বা স্মরণাতীত কাল হইতে বংশ পরম্পরায় বসবাস করিয়া আসিতেছে, তাই এই ভূমি ও বনই তাঁদের আশ্রয় ও অস্তিত্বের আঁধার বিধায় এই ভূমি ও বনের উপর তাঁদের প্রথা ও ঐতিহ্যগত অধিকার জন্ম লাভ করিয়াছে, যাহা আইন শাস্ত্র, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনেও এক স্বীকৃত বিষয়, এইখানে এ অঞ্চলের আদিবাসীরা এটিই তাঁদের প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত ভূমি মালিকানা বুঝাইবে;
(ট)‘প্রচলিত আইন’ অর্থ বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচেছদ ১৫২ (১) এ সংজ্ঞায়িত – “আইন” কে বুঝাইবে;
(ঠ) ‘বিধি’ অর্থ এই আইনের অধীন প্রণীত বিধি;
(ড)‘তফসিল’ অর্থ সরকার প্রদত্ত গেজেটে সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীদের তালিকা ।
দ্বিতীয় অধ্যায়
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা
৩ । কমিশন প্রতিষ্ঠা। – (১) এই আইন পূরণকল্পে, বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসি জনগোষ্ঠীর ভূমি কমিশন নামে একটি কমিশন প্রতিষ্ঠিত হইবে ।
(২) এই কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হইবে ও উহার একটি সাধারণ সিলমোহর থাকিবে এবং ইহা নিজ নামে মামলা দায়ের করিতে পারিবে বা ইহার বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা যাইবে ।
৪ । কমিশনের কার্যালয় । – কমিশনের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় হইবে এবং কমিশন প্রয়োজনে, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে, উহার শাখা কার্যালয় কোন বিভাগীয় শহরে স্থাপন করিতে পারিবে ।
৫ । কমিশন গঠন । – (১) চেয়ারম্যান ও অন্যূন একজন নারী সদস্যসহ অনধিক ০৯ (নয়) জন সদস্য সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হইবে;
(২) কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং তাহাদের নিয়োগের শর্তাবলী সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হইবে;
(৩) কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ অনূর্ধ্ব ০৩ (তিন) বৎসর মেয়াদের জন্য সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন;
তবে শর্ত থাকে যে, কোন ব্যক্তি চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে ০২ (দুই) মেয়াদের অধিক নিয়োগ লাভের যোগ্য হইবেন না;
(৪) কমিশনের চেয়ারম্যান ও একজন সদস্য-সচিব সার্বক্ষণিক হইবেন এবং অন্যান্য সদস্যগণ অবৈতনিক হইবেন ।
৬ । চেয়ারম্যান ও সদস্যগণের যোগ্যতা, ইত্যাদি । – (১) একজন কর্মরত (সিটিং) বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের মহামান্য হাই কোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি অথবা, একজন অবসর প্রাপ্ত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের মহামান্য হাই কোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি অথবা, সমতল অঞ্চলের একজন যোগ্য আদিবাসী যিনি জনপ্রশাসন, আইন, ভূমি ও মানবাধিকার কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখিয়াছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্য হইতে কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হইবেন;
(২) কমিশনের অন্যান্য সদস্যগণের নিযুক্তির ক্ষেত্রে নিম্নরুপ বিষয়, কর্ম-অভিজ্ঞতা, সম্পৃক্ততা, আগ্রহ, কৌতুহল ও আদিবাসী বিষয়ক জ্ঞান বিশেষভাবে বিবেচ্য –
(ক) ভূমি, প্রচলিত আইন, বন আইন ও প্রথা বা রীতিনীতি বিষয়ে সর্বজন স্বীকৃত একজন বিশেষজ্ঞ;
(খ) জনপ্রশাসন, আইন, ভূমি, মানবাধিকার, পরিবেশ ও সমতল অঞ্চলে আদিবাসী এলাকায় কর্মরত অথবা, পূর্ব কর্ম-দক্ষতা সম্পন্ন একজন সরকারি কর্মকর্তা;
(গ) ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের’ প্রতিনিধি যিনি সমতল অঞ্চল থেকে, যিনি যোগ্য এবং আদিবাসী বিশেষজ্ঞ এবং যিনি এই কমিশনের একজন সার্বক্ষনিক সদস্য-সচিব হিসেবে নিযুক্ত হইবেন;
(ঘ) বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের মহামান্য হাই কোর্ট বিভাগে অন্যূন ০৫ (পাঁচ) বৎসর এবং জেলা পর্যায়ে ১০ বছর আইন পেশায় নিয়োজিত একজন আদিবাসী আইনজীবী;
(ঙ) সমতল অঞ্চলে আদিবাসী এলাকায় কর্মরত কোন একজন সহকারি কমিশনার (ভূমি);
(চ) ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েসন (টিডব্লিউএ) এর প্রতিনিধি;
(ছ) জাতীয় আদিবাসী পরিষদের একজন প্রতিনিধি;
(জ) সমতল অঞ্চলে আদিবাসী এলাকায় ক্রিয়াশীল কোন নারী সংগঠনের বা সংস্থার একজন নারী নেত্রী বা কোন নারী নির্বাহী প্রধান ।
৭ ।প্রধান নির্বাহী । – (১) চেয়ারম্যান কমিশনের প্রধান নির্বাহী হইবেন ।
(২) চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে চেয়ারম্যান তাহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে, নবনিযুক্ত তাহার পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা চেয়ারম্যান পুনরায় স্বীয় দায়িত্ব পালনে সমর্থ না হওয়া পর্যন্ত সার্বক্ষনিক সদস্য-সচিব অথবা, সর্বসম্মতিক্রমেঃ কোন একজন কমিশন সদস্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করিবেন ।
৮ ।চেয়ারম্যান ও সদস্যগণের অযোগ্যতা, অপসারণ ও পদত্যাগ । – (১) কোন ব্যক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্য হইবার যোগ্য হইবে না বা চেয়ারম্যান বা সদস্য থাকিতে পারিবেন না যদি –
(ক) তিনি আদালত কর্তৃক দেউলিয়া বা অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হন ;
(খ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন কিংবা দোষী সাব্যস্ত হন ;
(গ) তিনি এই কমিশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য বিরোধী বা ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করিবার কাজে নিয়োজিত বা যুক্ত থাকেন ;
(ঘ) তিনি বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে বসবাসরত বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, স্বার্থ, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রথাগত রীতিনীতি অস্বীকার, অবহেলা কিংবা তুচ্ছ বা অবজ্ঞা করেন ।
(২) সরকার যুক্তিসঙ্গত মনে করিলে, কারণ দর্শাইবার যুক্তিসঙ্গত সুযোগ প্রদান করিয়া, কমিশনের চেয়ারম্যান বা কোন সদস্যকে অপসারণ করিতে পারিবে;
(৩) চেয়ারম্যান বা কোন সদস্য সরকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে যে কোন সময় পদত্যাগ করিতে পারিবেন ।
৯ ।সদস্যপদে শূন্যতার কারণে কার্য বা কার্যধারা অবৈধ না হওয়া । – শুধুমাত্র কোন সদস্যপদে শূন্যতার কারনে বা কমিশনের কোন কার্য বা কার্যধারা অবৈধ হইবে না বা তৎসম্পর্কে কোন প্রশ্ন বা আপত্তিও উত্থাপন করা যাইবে না ।
১০ ।বেতন, ভাতা ইত্যাদি । – (১) চেয়ারম্যান ও সার্বক্ষনিক সদস্য-সচিবের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হইবে ।
(২) অন্যান্য সদস্যগণ, কমিশনের সভায় যোগদানসহ অন্যান্য দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত হারে সম্মানী ও ভাতা পাইবেন ।
১১ ।কমিশনের সভা । – (১) এই আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে, কমিশন সভার ধরণ ও সভার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করিবে ।
(২) চেয়ারম্যান, কমিশনের সকল সভায় সভাপতিত্ব করিবেন এবং তাঁহার অনুপস্থিতিতে সভায় উপস্থিত সদস্যগণের মধ্যে আলোচনা ও সম্মতি সাপেক্ষে যে কোন একজন সদস্য সভায় সভাপতিত্ব করিবেন ।
(৩) সভাপতি এবং অন্যূন ০৪ (চার) জন সদস্যের উপস্থিতিতে কমিশনের সভার কোরাম হইবে ।
(৪) প্রতি ০৪ (চার) মাসে কমিশনের অন্যূন একটি সভা অনুষ্ঠিত হইবে ।
(৫) কমিশনের সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যেক সদস্যের একটি ভোট থাকিবে এবং ভোটের সমতার ক্ষেত্রে সভায় সভাপতিত্বকারী ব্যক্তির দ্বিতীয় বা নির্ণায়ক ভোট প্রদানের অধিকার থাকিবে ।
তৃতীয় অধ্যায়
কমিশনের কার্যাবলি
১২ । কমিশনের কার্যাবলি । – কমিশন নিম্নবর্ণিত সকল বা প্রাসঙ্গিক বা যে কোন কার্যাবলি সম্পাদন করিবে, যথা ঃ –
(ক) ভূমি, জলাভূমি, বন ও পরিবেশের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা অধিদপ্তরের সহিত বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে বসবাসরত সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, জলাভূমি, বন ও পরিবেশগত কার্যাবলি ও কর্মপদ্ধতির মধ্যে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে সরকারকে যথাযথ সুপারিশ প্রদান করা;
(খ) ভূমি, জলাভূমি, বন ও পরিবেশের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা অধিদপ্তরের সহিত এই অঞ্চলে বসবাসরত বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, জলাভূমি ও বনভূমি সম্পর্কিত সুদীর্ঘ ও জটিল বিরোধের নিষ্পতি লক্ষ্যে সরকারকে যথাযথ সুপারিশ প্রদান করা এবং এ ব্যাপারে যতদূর সম্ভব দ্্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা;
(গ) যথাসম্ভব ভূমি, জলাভূমি, বন ও পরিবেশের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা অধিদপ্তরে – ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরসহ এই অঞ্চলে বসবাসরত বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সহজ প্রবেশাধিকার এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে সাক্ষাতের জন্য বিশেষ সেল গঠনের লক্ষ্যে সরকারকে যথাযথ সুপারিশ প্রদান করা;
(ঘ) জেলা রেকর্ড রুম, সহকারি কমিশনার (ভূমি) ও ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহশীলদার) এর কার্যালয়ে সংরক্ষিত ভূমির প্রয়োজনীয় দলিলাদি ও কাগজপত্রাদি যেন এই অঞ্চলে বসবাসরত বৃহত্তর আদিবাসি জনগোষ্ঠী সহজে ও সরকার নির্ধারিত মূল্যে পরিদর্শন, পরিবীক্ষণ ও উত্তোলন করিতে পারে এ লক্ষ্যে সরকারকে সুপারিশ করা এবং এ ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করা;
(ঙ) দেশান্তরের ফলে, পরিকল্পিত রাজনৈতিক উদ্বাস্তু করবার ফলশ্রুতিতে এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও দেশ ত্যাগের ফলে বাস্তুচ্যূত হওয়ায় পরবর্তীতে ভূমির রেকর্ড ও জরিপের সময় জটিলতা ও বিভ্রান্তি এবং জমাজমির স্বত্ব ও দখল জনিত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও সরকারকে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ প্রদান করা;

(চ) অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১ ও অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তি বিধিমালা, ২০১২ এই আইন ও বিধিমালার ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট জটিলতা ও তামাদি বারিত হবার ফলে আইনগত দেউলিয়াত্বতা দূর করতে যথাযথ আইনগত সহায়তা প্রদান করা এবং এ লক্ষ্যে সরকারকে সুপারিশ করা;
(ছ) বন আইন ও বনে বসবাসকারী আদিবাসীদের মধ্যে সুদীর্ঘ ও বিদ্যমান বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও সরকারকে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ প্রদান করা;
(জ) কৃষি ও অকৃষি খাসজমি গরিব ও ভূমিহীন আদিবাসীদের জন্য বন্দোবস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা ও সরকারকে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ প্রদান করা;
(ঝ) আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ‘ইকো পার্ক,’ ‘রাবার বাগান’, ‘রাবার ড্যাম্প’ ও ‘ইট ভাটা স্থাপন’ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা ও সরকারকে প্রয়োজনীয় পরার্মশ প্রদান করা;
(ঞ) ভূমি, বন ও পরিবেশের ও রাজস্বের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা অধিদপ্তরের সময় সময় প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন, পরিপত্র, অফিস আদেশ, সার্কুলার ও বিজ্ঞপ্তি সংশ্লিষ্ট আদিবাসীদের যথাসময়ে জ্ঞাত করা; এবং
(ট) আদিবাসীদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমায় আইনগত প্রয়োজনীয় পরার্মশ প্রদান করা ও সরকারের কাছে সুপারিশমালা পেশ করা ।
(ঠ) উক্ত কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্ত কমিশন যে কোন সরকারী বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য, উপাত্ত বা কাগজপত্র সরবরাহের এবং প্রয়োজনে উক্ত কর্তৃপক্ষের যে কোন কর্মকর্তাকে স্থানীয় তদন্ত, পরিদর্শন বা জরীপের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিতে পারিবে এবং উক্ত কর্তৃপক্ষ বা কর্মকর্তা উহা পালনে বাধ্য থাকিবেন । কমিশন বা চেয়ারম্যান বা কমিশন কর্তৃক ক্ষমতা প্রদত্ত কোন সদস্য কোন বিরোধীয় ভূমি সরেজমিনে পরিদর্শন করিতে পারিবেন ।
(ড)কমিশন সাম্প্রদায়িক সম্পত্তি মোকাবেলায় উপযুক্ত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
১৩ । কমিশনের কার্যাবলির বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন । – (১) প্রতি বৎসরের ৩০ শে মার্চের মধ্যে কমিশন উহার পূর্ববর্তী বৎসরের কার্যাবলি, পদক্ষেপ, সিদ্ধান্তসমূহ ও সুপারিশমালা সম্বলিত একটি প্রতিবেদন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা অধিদপ্তরের নিকট উপস্থাপন করিবে, যাহাতে কমিশনের পরামর্শ ও সুপারিশ অনুসারে সরকার কোন কার্যকর সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারে ।
(২) উপ-ধারা (১) এর অধীন কমিশনের প্রতিবেদন প্রাপ্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতৃর্ক বাস্তবায়নকৃত প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর সরকার উহা জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের ব্যবস্থা করিবে ।
১৪ । Penal Code, 1860 (Act XXV of 1860) এর section 220 এবং Code of Criminal Procedure, 1898 (Act V of 1898)
এর section ৪৮০ এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কমিশন উক্ত ধারাসমূহের উল্লিখিত দেওয়ানী আদালত বলিয়া গণ্য হইবে এবং তদ্নুসারে কমিশন উহার অবমাননাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে৷চতুর্থ অধ্যায়
কমিশনে আবেদন দাখিল ও নিষ্পত্তি
১৪ । কমিশনে আবেদন দাখিল ও নিষ্পত্তি । – (১) কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা পরিবার বা সংস্থা বা সংঘ কিংবা সমিতি বা কোন জাতিগত গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় কোন ভূমির রক্ষা, বিরোধ নিয়ন্ত্রণ-নিষ্পত্তি-প্রশমন কিংবা আইনগত ব্যবস্থা বা পরামর্শের জন্যে কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করিতে পারিবেন । অথবা কমিশন স্বেচ্ছাপ্রনোদিত হয়ে অভিযোগ নিতে পাবেন।
(২) উপ-ধারা (১) এর অধীন দাখিলকৃত আবেদন পত্রের সহিত নি¤œবর্ণিত কাগজপত্র দাখিল করিতে হইবে, যথা ঃ –
(ক)যে কোন পর্যায়ের আবেদনকারীর ক্ষেত্রে আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি (যদি থাকে) বা নিবন্ধন সার্টিফিকেটের অনুলিপি বা গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় প্রধানের সুপারিশপত্র;
(খ)তপসিলে উল্লেখিত কোন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জাতীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ে সর্বজন স্বীকৃত বা নিবন্ধিত কোন সংগঠনের চেয়ারম্যান / সভাপতি অথবা সাধারন সম্পাদকের প্রত্যয়ণ পত্র;
(গ)ভূমির যাবতীয় কাগজপত্রসমূহ বা দলিলাদি;
(ঘ)মামলা-মোকদ্দমা সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্রাদি;
(ঙ)আদালতের আদেশ বা রায়ের সইমুহুরি নকল বা অনুলিপি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) ।
(৩)আবেদনপত্র প্রাপ্তির পর কমিশন উহার যথার্থতা নির্ধারণের লক্ষে প্রতিটি আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই পূর্বক নিষ্পত্তি করিবেন বা নিষ্পত্তির জন্যে সরকারের নিকট সুপারিশমালা পেশ করিবেন ।
(৪)কমিশন, প্রয়োজন সাপেক্ষে, প্রয়োজনীয় যে কোন পক্ষকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে নোটিশ প্রদান পূবর্ক কমিশনে উপস্থিত হইতে অনুরোধ করিতে পারিবেন ।
(৫)কোন আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে, কমিশন, ১৯০৮ সালের দেওয়ানী কার্যবিধি আইনের ধারা ৮৯ক (Mediation –মধ্যস্ততা) বা ৮৯খ (Arbitration – সালিস পদ্ধতি) এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য (Spirit) যথাসম্ভব আমলে নিবেন বা অনুসরণ করিবেন ।
কমিশনের সিদ্ধান্তের আইনগত প্রকৃতি এবং চূড়ান্ততা
ধারা ১৪-এ বর্ণিত কোন বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রী বলিয়া গণ্য হইবে, তবে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা বা যথার্থতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না৷
কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন
অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন কমিশনের সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রী, বা ক্ষেত্রমত, আদেশের ন্যায় কমিশন উহার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মাধ্যমে বা প্রয়োজনবোধে সরকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করিতে বা করাইতে পারিবে৷
(২) উপ-ধারা (১) এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সকল কর্তৃপক্ষ কমিশনের নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকিবে৷
(৬)কমিশনের একটি সহজাত বা অন্তর্নিহিত (Inherent Power) ক্ষমতা থাকিবে ।
পঞ্চম অধ্যায়
কমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী
১৫ ।কমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ । –
(ক)কমিশনের সার্বক্ষনিক সদস্য-সচিবই মূখ্য কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হইবেন;
(খ)কমিশন, সাংগঠনিক অনুমোদিত কাঠামো সাপেক্ষে, উহার কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবেন ।
(গ)কমিশন কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকুরী কমিশনের নিজস্ব চাকুরী বিধিমালা দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে ।
(ঘ)কমিশনের আইনী সহায়তা দেওয়ার জন্য আদিবাসী প্যানেল ল-ইয়ার নিয়োগ করা।
ষষ্ঠ অধ্যায়
বিবিধ
১৬ ।তহবিল । – (১) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে বসবাসরত বৃহত্তর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি [বিরোধ নিষ্পত্তি] কমিশন তহবিল নামে কমিশনের তহবিল থাকিবে এবং তহবিলে নিম্নবধিত অর্থ জমা হইবে, যথাঃ –
(ক)সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান;
(খ)যে কোন বৈধ উৎস হইতে প্রাপ্ত অনুদান;
(গ)কমিশন কর্তৃক ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের সুদ ।
(২)তহবিলের অর্থ কমিশনের নামে কমিশন কর্তৃক নির্দিষ্টকৃত কোন তফসিলি ব্যাংকে জমা রাখিতে হইবে এবং উক্ত ব্যাংক হইতে অর্থ উত্তোলনের পদ্ধতি বিধি দ্বারা নির্ধারিত হইবে ।
(৩)তহবিল হইতে কমিশনের চেয়ারম্যান, সার্বক্ষনিক সদস্য-সচিব, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও চাকুরীর শর্তাবলি অনুসারে প্রদেয় অর্থ প্রদান করা হইবে এবং কমিশনের প্রযোজনীয় অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করা হইবে ।
১৭ ।হিসাব রক্ষণ ও নিরীক্ষা । –
(১) কমিশন যথাযথভাবে হিসাব রক্ষণ করিবেন এবং হিসাবের বার্ষিক বিবরণী প্রস্তুত করিবে ।
(২) প্রতি বৎসর কমিশন নিবন্ধিত হিসাব নিরীক্ষক দ্বারা কমিশনের হিসাব-নিরীক্ষা করিবেন ও নিরীক্ষা রিপোর্টের অনুলিপি সরকারের নিকট পেশ করিবেন ।
১৮ । জনসেবক । – কমিশনের চেয়ারম্যান, সার্বক্ষনিক সদস্য-সচিব, কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ কমিশনের দায়িত্ব পালন কালে একজন জনসেবক (Public Servant) বলিয়া গণ্য হইবেন ।
১৯ । ক্ষমতা অপর্ণ । – কমিশন লিখিত আদেশ দ্বারা, এই আইনের অধীন উহার সকল ক্ষমতা কমিশনের কোন সদস্য, কর্মকর্তা বা অন্য কোন ব্যক্তিকে অর্পণ করিতে পারিবে ।

২০ । কমিশনের কার্যকাল । – এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অথবা জাতীয় সংসদ কর্তৃক এই আইন রহিত না হওয়া পর্যন্ত এই আইন কার্যকর থাকিবে ।

২১ । বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা । – এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কমিশন, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে, গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে ।

২২ । ইংরেজিতে অনূদিত পাঠ প্রকাশ । – এই আইনের বাংলা পাঠের ইংরেজিতে অনূদিত একটি নির্ভরযোগ্য পাঠ প্রকাশ করিতে পারিবে ।

……………………………………………………..
জান্নাত-এ-ফেরদৌসী, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কালেকটিভ(RDC)