১০ এপ্রিল ১৯৯২, পাহাড়ের আদিবাসীদের কাছে বিভীষিকাময় এক দিন। পাহাড়ে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসব বিজু, বৈসু, সাংগ্রাইয়ের তিন দিন আগে সংঘটিত হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে অন্যতম বর্বর হত্যাকাণ্ড। ঠিক ২৬ বছর আগে এইদিনে খাগড়ছড়ির পানছড়ি উপজেলার লোগাংয়ে পাহাড়ি গুচ্ছগ্রামে এই গণহত্যার ঘটনা ঘটে, যা লোগাং গণহত্যা নামে পরিচিত।

এক বাঙালি রাখাল বালককে হত্যায় তৎকালীন শান্তিবাহিনীকে অভিযোগ করে সেনাবাহিনী, বিডিআর(বর্তমান বিজিবি), আনসার-ভিডিপির সহযোগীতায় সেটলার বাঙালিরা এ হত্যাকাণ্ড চালায়। সেটলাররা দা, বটি, কুড়াল দিয়ে নিরীহ আদিবাসীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সেনাবাহিনী ও বিডিআর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। শিশু, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ নর-নারী কেউ রেহায় পায়নি সেদিন। দুই শতাধিক পাহাড়ি আদিবাসী মারা যায়, অনেকে নিখোঁজ হয়। আগুনে পুড়িয়ে ছাঁই করে দেয়া হয় শতশত বাড়িঘর।

এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের কারনে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুর আনন্দ শোকে পরিণত হয়। ১৩ এপ্রিল খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে হাজার হাজার লোকের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী, লেখক-সাংবাদিক বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভে শামিল হন। হাজার হাজার প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রতিবাদ ও নিহতদের স্মরণ করা হয়।

ঢাকা থেকে উৎসবে যোগ দিতে যাওয়া রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার কর্মী, লেখক-সাংবাদিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে যেতে চাইলে তাদের নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের বাঁধা দেয় পানছড়ি উপজেলার সেনাবাহিনী। প্রবীণ রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য, আইনজীবী সারা হোসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনু মুহাম্মদ সহ ২২ জন ঢাকায় ফিরে এক বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে জানানো হয়, খাগড়াছড়ি গিয়ে আমরা স্বভাবতঃই ঐ অঞ্চলে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করি ঘটনার সত্যাসত্য জানবার দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু পরের দিন ১২ই এপ্রিল লোগাং যাবার পথে পানছড়িতে আমরা বাধাপ্রাপ্ত হই এবং আমাদের নিরাপত্তার কথা বলে নিরাপত্তাবাহিনী আমাদের ঘটনাস্থলে যেতে বাধা প্রদান করে। ফিরবার পথে এবং খাগড়াছড়িতে বহুসংখ্যক প্রত্যক্ষদর্শী এবং ঘটনার শিকার ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। কর্তৃপক্ষীয় বিভিন্ন ব্যাক্তির সাথেও আমাদেও কথা হয়। এ সব কিছু থেকে আমরা স্পষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, লোগাং গ্রামে একটি গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে। একজন বাঙালী কিশোর নিহত হওয়ার সূত্র ধরে সেখানে চাকমা ও ত্রিপুরা গুচ্ছগ্রামে গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (ভিডিপি) ও আনসার বাহিনীর কিছু বাঙালী দুষ্কৃতকারীর সহযোগীতায় হামলা চালায়। চারশরও বেশি ঘর সেখানে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয় এবং শিশু-নারী-বৃদ্ধসহ ২ শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। এ বর্বর গণহত্যার বর্ণনা শুনে আমরা স্তম্ভিত হই, এর নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। এ বর্বর গণহত্যার কারণে পুরো অঞ্চলে পাহাড়ী জনগণের বার্ষিক উৎসবের সকল কর্মসূচী পরিত্যাক্ত হয়। আনন্দমুখর জনপদ শোক ও অশ্রুর জনপদে পরিণত হয়। ঘরছাড়া, মা হারানো, বাবা হারানো, সন্তান হারানো নিরীহ দুর্বল দরিদ্র জনগণের সঙ্গে আমরাও ক্ষুব্ধ। একই সঙ্গে আমরা ক্ষুব্ধ প্রকৃত ঘটনা চেপে রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের ন্যাক্কারজনক চেষ্টায়।

এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ২৮ এপ্রিল ১৯৯২ পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ লোগাং অভিমুখে পদযাত্রা করে। হাজার হাজার মানুষের এই পদযাত্রা প্রতিনিয়ত সেনাবাহিনীর বাঁধা পেরিয়ে লোগাং পৌছায় এবং সেখানে ফুল দিয়ে নিহতদের সন্মান জানানো হয়।

আজো পাহাড়ের আদিবাসীরা শোকভরে স্মরণ করে লোগাং গণহত্যার সেই ইতিহাস। সামরিক শাসনে থাকা পাহাড়ি আদিবাসীরা আজো কোন গণহত্যার বিচার পায়নি। উপরন্তু বিচার চাইতে গিয়ে, প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে হত্যা-গুম আর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে কেবল। এ নির্যাতনের ধারায় এখনো নির্যাতিত হয়ে চলেছে পাহাড়ের আদিবাসীরা।