আজ ৮ মার্চ। আন্তজার্তিক নারী দিবস। সারা বিশ্বের নারী সমাজকে আমরা নারী দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। এবছর নারী দিবসে জাতিসংঘের স্লোগান Time is now: Rural and urban activists transforming women’s lives, , যার অর্থ দাঁড়ায় এখনই সময় গ্রামীণ ও শহুরে নারী সমাজের জীবনমান অগ্রগতি নিশ্চিত করার। আপনারা জানেন, সমাজে নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এবং রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক সকল ক্ষেত্রে নারীর উপর চলমান বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন, সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সংগ্রামসহ সমাজ প্রগতির আন্দোলনে ৮ মার্চ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। বিশ্ব নারী দিবস পালনের পিছনে রয়েছে এক অনন্য ইতিহাস, নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ আমেরিকার নিউইউর্ক শহরে একটি সুচ কারখানার নারী শ্রমিকরা তাদের কর্মঘন্টা ১২ ঘন্টা থেকে ৮ ঘন্টায় কমিয়ে আনার দাবিতে ও বৈষম্যহীন ন্যায্য মজুরি আদায়ের দাবিতে পথে নামেন। তাদের উপর নেমে আসে পুলিশি নির্যাতন। এ আন্দোলনে আটক হন অনেক নারী শ্রমিক। ১৮৬০ সালে ঐ কারখানার নারী শ্রমিকগণ শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করেন আর সাংগঠনিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। তার দীর্ঘদিন পর ১৯০৮ সালে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্ব প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে বিশ্বের দেশে দেশে অব্যাহতভাবে নারী সমাজের জাগরণ ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘও ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৭৬ হতে ১৯৮৫ সময়কালকে নারী দশক হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে এই আন্তর্জাতিক নারী দিবস আরও ব্যাপকতা লাভ করে এবং বিশ্বব্যাপী নারী সমাজের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ ও গভীর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে থাকে। বলাবাহুল্য, ইতোমধ্যে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদার বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও বাস্তবে গুণগত ও সামগ্রিকভাবে বিশ্বের দেশে দেশে নারীরা এখনও শোষণ, ব না, অবহেলা, নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে চলেছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নারীরা প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লংঘন এবং জাতিগত আগ্রাসন, সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হতে বাধ্য হচ্ছে।

প্রতি বছরের মত বাংলাদেশের আদিবাসী নারীরাও আজ আন্তর্জাতিক বিশ্ব নারী দিবস পালন করছে। সেই সাথে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে, সত্তর দশকে যিনি পাহাড়ে নারী মুক্তির আওয়াজ তুলেছিলেন। ১৯৭৩ সালে পাহাড়ী নারীদের সাংগঠনিক কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে মূলত ১৯৭৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি গঠন হয়। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটে।

১৯৭৫ সালে যে সময় জাতিসংঘ কর্তৃক ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে পালিত হয় ঠিক সেই সময়ে ৩৫ জন পাহাড়ী নারী অধিকার আদায়ের লক্ষে শান্তিবাহিনীতে যোগদান করেন। তাঁরা হয়ত অনেকেই আজ বেঁচে নেই। তাদেরকেও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। সমতল অ লে বিপ্লবী আদিবাসী নারী হাজংমাতা রাশিমণি হাজং এবং ফুলমণি’র বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম এবং পাহাড়ে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমার সাংগঠনিক তৎপরতা প্রান্তিক মানুষের সংগ্রামে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে।

মোটা দাগে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও এদেশের আদিবাসী নারীরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কেমন আছেন সেদিকে আলোকপাত করব। বলাবাহুল্য, ইতোমধ্যে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নারীর সম-অধিকার ও সম-মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও বাস্তবে গুণগত ও সামগ্রিকভাবে বিশ্বের দেশে দেশে নারীরা এখনও শোষণ, বঞ্চনা, অবহেলা, নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে চলেছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নারীরা প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লংঘন এবং জাতিগত আগ্রাসন, সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা পাহাড় বা সমতলে কঠিন সংগ্রাম ও লড়াই করে বেঁচে আছে। মোটাদাগে বলা যায়, পাহাড় বা সমতলের আদিবাসীদের বঞ্চনা ও সংগ্রামের কাহিনী প্রায় একই সূত্রে গাঁথা। দেশব্যাপী আদিবাসীদের উন্নয়নের নামে ভূমি দখল, ভূমির কারণে নারীর উপর শ্লীলতাহানির মত মানবাধিকার লঙ্ঘন, মিথ্যা মামলা, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় সেটেলার প্রেরণ, সামরিকীকরণ, আদিবাসী এলাকায় খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ফলে ভূমি উচ্ছেদকরণ প্রভৃতি ঘটে চলেছে।

সামাজিক প্রেক্ষাপটে আদিবাসী নারীরা খুবই প্রান্তিক অবস্থায় বসবাস করছে। আদিবাসী নারীরা জাতিগত, লিঙ্গগত, ভাষাগত, ধর্মীয়গত এবং শ্রেণীগত কারণে বৈষম্যের শিকার হয়। ফলে এসব কারণে বাংলাদেশের আদিবাসী নারীরা বিভিন্ন ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়।
—–
বাংলাদেশের আদিবাসী নারীঃ

স্বাধীনতার চার দশকে অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্জন একটি বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত। নারী-পুরুষ বৈষম্য বা জেন্ডার ব্যবধান হ্রাসে বাংলাদেশের অবস্থান ধীরে ধীরে উন্নীত হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের সামগ্রিক নারী সমাজের সাথে আদিবাসী নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছে এবং নিজ সমাজের উন্নয়নে, আদিবাসী অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে ভিন্ন ভিন্ন ৫৪টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসীর অর্ধেক অংশ নারীদের যুগ যুগ ধরে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, বঞ্চনা, নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে। যা তাদের টেকসই উন্নয়নে অংশীদারিত্বের পথকে রূদ্ধ করে তুলছে।

এমডিজি থেকে দেশের আদিবাসীরা সুফল লাভ করেনি। তাদের কাছে পৌঁছেনি এমডিজি সেই কাংখিত উন্নয়নের ছোঁয়া। তাই তারা এসডিজি বাস্তবায়নে তাদের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে চায়। তারা পিছিয়ে থাকতে চায় না।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (২০১৫/১৬-২০১৯-২০) বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলা হলেও তা খুব যথেষ্ট নয় বলেই আদিবাসীরা মনে করে। বিশেষ করে আদিবাসী নারী সমতা ও ক্ষমতায়নের ব্যাপারে তেমন কোন উদ্যোগ নেই। তার উপর যেটুকু উন্নয়ন নারীরা নিজেদের সাহসিকতা ও দক্ষতায় করছে তার চেয়েও বেড়ে চলেছে আদিবাসী নারীর প্রতি চলমান সহিংসতা।

এছাড়া আদিবাসীদের বিষয়ে সরকারের কোন স্বতন্ত্র পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু জাতি-বর্ণ-লিঙ্গ-পেশা নির্বিশেষে সকল ক্ষেত্রে এসডিজি বাস্তবায়ন সফল করতে গেলে এবং ‘কাউকে পেছনে ফেলে না রাখা’ এসডিজির অন্যতম এই স্পিরিট বাস্তব রূপদান করতে চাইলে অবশ্যই এসডিজি বাস্তবায়নে আদিবাসী জাতিসমূহকে দৃশ্যমান করতে হবে, তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে এবং তজ্জন্য আদিবাসীদের পৃথক পরিসংখ্যানের কোন বিকল্প নেই।

আদিবাসী নারী ও শিশুদের অধিকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিশ্র উন্নয়ন হলেও তাদের শিক্ষা অধিকার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষার পদ্ধতি প্রচলনের উদ্যোগ হিসেবে এ বছর ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি ভাষাসহ দেশের মোট পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রায় ২৫ হাজার ছাত্রছাত্রীর জন্য ৫০ হাজার বই ছাপিয়ে বিলির ব্যবস্থা করেছে। সরকারের এই কর্মপ্রয়াস প্রসংশনীয় হলেও বস্তুত সরকারের এই উদ্যোগ ছিল দায়সারা গোছের ও পরিকল্পনাহীন। ফলে অনেক আদিবাসী ছাত্রছাত্রী মাতৃভাষার বই পায়নি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাবে উক্ত মাতৃভাষার বই পড়ানোর ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ না থাকার কারণে প্রতি বছর অনেক আদিবাসী নারী ও শিশু মারা যাচ্ছে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো গত জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে প্রতিষেধক টীকা ও যথাযথ চিকিৎসার অভাবে ১০ জন ত্রিপুরা শিশু মারা যাওয়া এবং আরো ৭৫ জন শিশু রোগে আক্রান্ত হওয়া। সীতাকুন্ডে যে কয়জন শিশু মারা গেছে তার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অপুষ্টিজনিত ও টিকার অভাব। ফলে আদিবাসী গ্রামগুলো শুধু ম্যালেরিয়া বা ডায়রিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত নয়, বরং সরকারের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছে বলে আমরা ধরে নিতে পারি। সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ তারিখে দুলিরাং ত্রিপুরা (৪) ও ১৮ ফেব্রুয়ারী জীবন ত্রিপুরা (৮) নামের আরো দুজন শিশুর মৃত্যু হয় সীতাকুন্ডে এবং ৩৫ জন শিশু অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়। (তথ্যসূত্রঃ সময়ের কন্ঠস্বর)

অধিকাংশ আদিবাসীদের বসতি দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় আদিবাসীরা, বিশেষ করে নারীরা সীমিত স্বাস্থ্যসেবা লাভ করে থাকে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শিশুরা কম ওজনে জন্মগ্রহণ করে থাকে। এটা কেবল শিশুদের দুর্বল স্বাস্থ্যের জন্য নয়, চরম পুষ্টিহীনতাও এর একটি অন্যতম কারণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম শিশু মৃত্যুর হার জাতীয় গড় থেকে অনেক বেশী। এই চিত্র দেশের অন্যান্য অ লে বসবাসকারী আদিবাসী জাতিসমূহের বেলায় আরো বেশী করুণ তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষার জন্য জাতীয় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা থাকলেও আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য নির্দিষ্ট কোন নীতিমালা নেই। সংবিধানে নারীর জন্য জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পৌরসভাসহ উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের জন্য আইন পাশ হয়। এতে জাতীয় স্তরে ও স্থানীয় প্রশাসনে নজিরবিহীনভাবে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু আদিবাসী নারীদের জন্য জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় সরকার পরিষদগুলোতে কোন আসন সংরক্ষিত নেই। ফলে দেশের শাসনব্যবস্থায় ও উন্নয়নে বিশেষ করে সমতলের আদিবাসী নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে জেন্ডার বাজেটেও আদিবাসী নারীদের জন্য পৃথক কোন বরাদ্দ নেই। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ কার্যাদি বিভাগ থেকেও আদিবাসী নারীদের ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক কাজে ও আদিবাসী নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আর্থিক সহায়তা প্রদানের বিশেষ বরাদ্দ নেই। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ সেখানেও আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য বিশেষ কোনো কিছু উল্লেখ নেই।

বাংলাদেশের আদিবাসী নারীদের বৈষম্য ও নির্যাতন

বাজার প্রক্রিয়ায় সীমিত প্রবেশাধিকার, স্বাস্থ্য সেবা, কর্মসংস্থান, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সুবিধা, শিক্ষা, প্রথাগত উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত ছাড়াও শ্লীলতাহানির শিকার, নারী পাচার, পারিবারিক নির্যাতন ও দীর্ঘদিন সামরিক শাসন আদিবাসী নারীদের আরো বেশি প্রান্তিকতায় ঠেলে দেয়। এছাড়া বারবার উচ্ছেদের কারণে আদিবাসী নারীরা আরো বেশি প্রান্তিকতার শিকার হয়।

গভীর উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এসব অপরাধের যথাযথ বিচার হয়নি এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়নি। ২০১৬ সালে ১৪ জন জুম্ম নারী ও শিশু ধর্ষণ, ৬ জন ধর্ষণের চেষ্টা, ৩ জন যৌন নিপীড়ন ও ১ জন অপহরণের শিকার হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্যসূত্র মতে, ২০১৭ সালে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, অপহরন ও শারীরিক নির্যাতনের মত ঘটনা ঘটেছে ৪৬টি যেখানে প্রায় ৫৬ জন আদিবাসী নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। সর্বশেষ গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ রাঙ্গামাটি জেলাধীন বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে ওরাছড়ি গ্রামে সেনাসদস্য কর্তৃক এক মারমা কিশোরী ধর্ষণ ও তার ছোট বোনের শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠলেও অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির ব্যবস্থা না করে উল্টো ভুক্তভোগীদের হয়রানি করা এবং বিচার চাইতে গিয়ে রাণী য়েন য়েনসহ বিচারপ্রার্থীদের নাজেহাল ও নির্যাতন করা হয়েছে। এতে, খোদ রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম নারীদের চরম অমর্যাদা ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা সৃষ্টি করার চিত্র ফুটে উঠেছে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় (২০১৩) দেখা গেছে, আদিবাসী নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক নীতি,দোষীদের দায়মুক্তি অর্থাৎ শাস্তির আওতায় না আনা, বিচার বিভাগের প্রলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া ও বিরুপ পরিবেশ, বিচার ব্যবস্থা সর্ম্পকে আদিবাসীদের সচেতনতার অভাব ও অনভিজ্ঞতা, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতি ও অনিয়ম, আদিবাসীদের দুর্বল প্রথাগত অনুষ্ঠান, ভূমি জবরদখল ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া, সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইনি ও বস্তগত সহায়তার অভাব, ঘটনার অব্যাহত অনুগামী কর্মসূচী ও পরিবীক্ষণের অভাব, ঘটনার শিকার পরিবারের নিরাপত্তার অভাব, জাতীয় মানবাধিকার ও নারী সংগঠনের বলিষ্ঠ ভূমিকার অভাব ইত্যাদি।

বস্তুত আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতার পেছনে অন্যতম একটি লক্ষ্য হল পাশবিক লালসার পাশাপাশি আদিবাসীদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করা, আতঙ্কে সৃষ্টি করে তাদের জায়গা জমি থেকে বিতাড়ন করা এবং চূড়ান্তভাবে তাদের জায়গাজমি দখল করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রায় ১৭ বছর পার হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় সেটেলার বাঙালী কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর উপর সহিংসতাসহ ভূমিকে কেন্দ্র করে আদিবাসীদের উপর প্রতিনিয়ত হামলা, হত্যা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি মানবতা বিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-উত্তরকালেও পাহাড়ী নারী সমাজের উপর জাতিগত নিপীড়ন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রধান কারণ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়া। এরমধ্যে অন্যতম কারণ হল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী অধ্যুষিত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারের কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা। পক্ষান্তরে সরকারের বিভিন্ন মহল কর্তৃক সেটেলার বাঙালীদের পুনর্বাসন; সেটেলার বাঙালীদের গুচ্ছগ্রাম সম্প্রসারণ, ভূমি জবরদখলে সেটেলার বাঙালিদেরকে মদদদান; রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ বহিরাগতদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণ, পার্বত্য চুক্তিকে লঙ্ঘন করে সেটেলার বাঙালীদের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে গণ্য করে টাস্কফোর্স কর্তৃক পুনর্বাসনের উদ্যোগ, জেলা প্রশাসন কর্তৃক স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান; চাকুরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদান; বহিরাগতদের নিকট অব্যাহতভাবে ভূমি বন্দোবস্তী ও ইজারা প্রদান ইত্যাদি পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিপন্থী কার্যক্রম বাস্তবায়র করা হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জুম্ম নারীর উপর সংঘটিত যৌন হয়রানি, ধর্ষণ হত্যা ও অপহরণের বিরুদ্ধে যতগুলো মামলা হয়েছে তার কোন উদাহরণ নেই যে দোষী ব্যক্তিরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছে। দেশের সমতল অঞ্চলে দু/একটি মামলার আদালত অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত ও শাস্তির রায় দিলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ঘটনায় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলশ্রুতিতে অপরাধীরা সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্তি পেয়ে থাকে। ফলে সহিংসতার শিকার আদিবাসী নারীরা ন্যায় ও সুবিচার থেকে বরাবরই বি ত হয়ে আসছে।

সুপারিশমালা

১ঃআদিবাসী নারীর সকল মানবাধিকার নিশ্চিত করা।
২ঃআদিবাসী নারী ও শিশুর উপর সহিংসতা বন্ধে দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিরাপত্তা জোরদার করা।
৩ঃআদিবাসী নারী ও শিশুর উপর সহিংসতার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা।
৪ঃসহিংসতার শিকার আদিবাসী নারী ও শিশুদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা প্রদান করা।
৫ঃনারী উন্নয়ন নীতিমালায় আদিবাসী নারীদের জন্য আলাদা একটা অধ্যায় রাখা এবং সকল ধরনের নীতিমালা গ্রহনের পূর্বে আদিবাসী নারী নেতৃবৃন্দের পরামর্শ গ্রহণ করা।
৬ঃপার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করা এবং এলক্ষ্যে সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করা।
৭ঃআদিবাসী নারীদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৮ঃআদিবাসী মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যু কমানোর লক্ষ্যে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৯ঃভূমি ও সম্পত্তির উপর আদিবাসী নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বন, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ১০ঃআদিবাসী নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকার করা।
১১ঃশিক্ষা কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে আদিবাসী নারীদের জন্য কোটা নিশ্চিত করা এবং বিধবা ও বয়স্ক ভাতা নিশ্চিত করা।
১২ঃ জাতীয় সংসদে অঞ্চলভিত্তিক এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় আদিবাসী নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
——–
বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের যৌথ আয়োজনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আজ সকালে ঢাকার আগারগাও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এক আলোচনা সভায় পঠিত প্রবন্ধ।