শ্যাম সাগর মানকিনঃ বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের যৌথ আয়োজনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আজ সকালে ঢাকার আগারগাও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।”আদিবাসী নারীর নিরাপত্তা ও সমমর্যাদা নিশ্চিতকরণে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলুন” এই স্লোগানে সকাল ১০টা থেকে দুপুর পর্যন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় বক্তারা বাংলাদেশে আদিবাসীসহ সামগ্রিক নারীদের নিরাপত্তাহীনতা, নারীদের উপর ক্রমশ ধর্ষণ-হত্যা এবং বিচারহীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
কলাম লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ তার বক্তব্যে বলেন আদিবাসী এলাকায় নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসন খুব বেশি তৎপর নয়। যেখানে মূলধারার নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়, সেখানে দুর্বল অংশগুলোর প্রতি প্রশাসনের নজর আরো নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমরা যদি সফলতা অর্জন করতে চাই, তবে নারীদের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু এই সংখ্যা দিয়ে কিছু হবেনা। যতক্ষণ নীতি নির্ধারনী জায়গায় নারীরা ভুমিকা রাখতে না পারবে ততদিন পুরোপুরি সফলতা অর্জন সম্ভব নয়।
পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন নারীর নিরাপত্তা পাহাড়ের নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে বলেও তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত না হলে পাহাড়ে নারী পুরুষ কারোরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবেনা।

বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের যুগ্ম আহবায়ক রাখি ম্রং বলেন অনেক আইন থাকার পরেও বাংলাদেশে নারী নির্যাতন থেমে নেই। আদিবাসী সমাজে খুন-ধর্ষণ এসব খুব একটা ছিলনা কিন্তু এখন তা বেড়ে যাচ্ছে। এখন আদিবাসী পুরুষ দ্বারাও নির্যাতিত হচ্ছে আদিবাসী নারী।

তিনি বিচারহীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ২০০৭ থেকে এখন পর্যন্ত আদিবাসী নারীদের উপর যে অন্যায় অত্যাচার হয়েছে তার কোনটারই বিচার হয়নি।

নারীদের প্রতি সহিংসতার কারনে দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার এভিলিনা চাকমা । তিনি আরো বলেন, ধর্ষণের জন্য নারীর পোষাককে দায়ী করা হয়, কিন্তু মারমা দুইবোন তাদের নিজের বাড়িতে ধর্ষণের ও নির্যাতনের শিকার হয়। পুরুষের মানসিকতা ধর্ষণের জন্য দায়ী। নারীর প্রতি সহিংসতার কোন বিচার হয়না বলেও তিনি শংকা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা তার বক্তব্যে বলেন, নারী দিবস আজকে যে পালন করছি, তা প্রতিষ্ঠা করতে দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে। এবং এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি যে দর্শন ভুমিকা রেখেছে তা হল মার্ক্সীয় দর্শন।

আদিবাসী বা পাহাড়ী নারীদের লড়াই নারীদের মুক্তিতেও মার্ক্সীয় দর্শনের গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

আফগানিস্থানের দুটো সময়কালের কথা উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আফগানিস্থান যখন সমাজতান্ত্রিক ছিল তখন আফগানিস্থানের নারীরা এখনকার চেয়ে অনেক বেশি মুক্ত স্বাধীন ছিল।


দীপায়ন খীসা আরো বলেন, বাঙ্গালী নারীদের উপর নিপীড়ন আইন শৃংখলা বাহিনীর দ্বারা খুব একটা হয়না, কিন্তু পাহাড়ে বা আদিবাসী নারীরা আইন শৃংখলা বাহিনীর দ্বারা বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
নারী পুরুষের সমমর্যাদা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যার্থ। ফলে এই রাষ্ট্র কাঠামোকে বদলানো গেলে সমাজতন্ত্রের আলোকে যদি বাংলাদেশকে গড়া যায় তবে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে ধাবিত হওয়া সম্ভব।

সমাজই মানুষের, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। আইন কানুন প্রয়োজন তবে শুধু আইন সব নিশ্চিত করতে পারেনা বলে তার বক্তব্যে বলেন এএলআরডির উপপরিচালক রওশন জাহান মনি। তার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন হলে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো। যেহেতু সেই অঞ্চলের লোকজন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকতো। ফলে চুক্তি বাস্তবায়ন চাই। বাস্তবায়ন দরকার।

আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং তার বক্তব্যে বলেন, আদিবাসী সমাজে নারীরা অন্যান্য সমাজের নারীর থেকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। তবে আদিবাসী পুরুষ বদলে যাচ্ছে। মূলধারার পুরুষের মত হয়ে উঠছে।

প্রতিষ্ঠিত অনেক ধর্মেই নারীদের পুরুষের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে, কিন্তু আদিবাসী অনেক ধর্মেই নারীদের প্রধান করে দেখানো হয়েছে। আদিবাসী সমাজে বরপণ নাই, অন্যদিকে বরং কন্যাপণ রয়েছে বলেও তিনি জানান।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আদিবাসী নারীদের অনেক অবদান রয়েছে। তাদের সেই অবদানের ইতিহাসই আমার জীবনের অনেক বড় প্রেরণা বলে তার বক্তব্যে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞানের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন কণা । তিনি বানিজ্যিক ধারার নারী দিবস পালনের সমালোচনা করে বলেন, বাংলাদেশের বৃহৎ নারী শ্রমিক গোষ্ঠী এই নারী দিবস উদযাপনের বাইরে। নারী দিবসের মৌলিক অনুপ্রেরণা থেকে বের হয়ে বানিজ্যিক নারী দিবস পালন করা হচ্ছে।

আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সহসভাপতি চন্দ্রা ত্রিপুরা এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফাল্গুনী ত্রিপুরা। জয়শ্রী চাকমার সঞ্চালনায় আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মনিরা ত্রিপুরা। আলোচনা সভায় বিভিন্ন আদিবাসী ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।