জীবনের সমতল থেকে পাহাড় নানা শব্দ, রূপকল্প আর প্রত্যয় শুনে দেখে ছুঁয়ে শুঁকে আমরা বড় হই। এর ভেতর কোনো কোনো শব্দ হারিয়ে যায়, কোনোটা বদলে যায় আর কোনোটাবা আরো মুখর হয়ে আগলে থাকে। তো স্কুলের মাঝদিকে এরকমই এক শব্দ শুনে সেই বালক বয়সে ধাক্কা লাগে মনে। তখন প্রথম শুনি ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত’ শব্দখানা। বেগম রোকেয়াকে এই বিশেষণ দিয়ে পরিচয় করানো হয়েছিল, এখনো হয়। কলেজ জীবনে তখন পারিবারিকভাবে আমরা উদ্ভিন্ন নামের এক আবৃত্তি সংগঠন শুরু করেছি নরসিংদীতে। বড় বোন তখন ইংরেজি সাহিত্যে পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার মাধ্যমেই পরিচিত হই আরেক নতুন শব্দের সাথে ‘নারীবাদী’, ইংরেজিতে ফেমিনিস্ট। পরপর এরকম কত শব্দের সাথে পরিচয় ঘটতে থাকে! নারীনেত্রী। উইমেন অ্যাকটিভিস্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ ও যৌননিপীড়রন বিরোধী আন্দোলন থেকে পরিচয় হয় নানাজনের সাথে। তাদের কেউ কেউ নিজেদের পরিচয় দেন ‘নারীনেত্রী’, ‘নারী সংগঠক’, ‘নারী অধিকারকর্মী, ‘নারীকর্মী’, ‘নারীবাদী’, ‘জেন্ডার বিশেষজ্ঞ’ এবং এমনকি ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ কেউবা ‘উইমেন অ্যাক্টিভিস্ট’।

স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মূলত লিঙ্গীয় প্রান্তিকতার সাথে জড়িত মানুষদের নানা পরিচয় ব্যক্তিগত দিনলিপিতে বিস্ময় ও তৎপরতা তৈরি করে। এই পরিক্রমায় নারী, জেন্ডার ও লিঙ্গীয় ডিসকোর্সের পরিসর ও রাজনৈতিকতা কিছুটা হলেও আন্দাজ করে চলেছি। বুঝতে চেয়েছি ক্ষমতা, বৈষম্য, বাণিজ্য ও মনস্তত্ত্ব কীভাবে সামাজিক লিঙ্গীয় দরবার অনিবার্যভাবে টিকিয়ে রেখেছে। বিদ্যমান সামাজিক শ্রেণি, বর্গ, তন্ত্র, নীতি ও নথি গুলোও জানাবোঝার চেষ্টা করেছি। এখনও বোঝার চেষ্টা করে চলেছি পুরুষ, নারী ও হিজড়াদের আন্ত:সম্পর্ক ও সংঘাতসমূহ। জেনেছি খনা, বেগম রোকেয়া, ইলা মিত্র, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, লীলা নাগ, রাশিমনি হাজং, লীলাবতী সিংহ, দামিনী গোয়ালা, গীতিদা রেমা, কল্পনা চাকমা, কুমুদিনী হাজং, কাঁকেত হেনইয়তা, চন্দ্রাবতী, করুণাময়ী সর্দার, ফুলমনি মুরমু, তারামন বিবি, টেপরী বর্মণী, মিজি মৃ, নসিফ পথমি, জাহানারা ইমাম, সুদেষ্ণা সিনহা, মনোরমা বসু, সুফিয়া কামাল, হেনা দাস, বিশদমনি টপ্প্য কিংবা বিচিত্রা তির্কীর মত দেশের কত শত অবিস্মরণীয় সব নারীদের দর্শন ও সংগ্রাম। এঁরা উপনিবেশিকতা, লিঙ্গবৈষম্য, সার্বভৌমত্ব, আত্মপরিচয়, ন্যায্যমজুরি, অন্যায় শাসন, কৃষি, ভূমি, অরণ্য, সামাজিক সংস্কৃতি, জাতিগত নিপীড়ন, মাতৃভাষার স্বীকৃতি, যৌননিপীড়ন, যুদ্ধাপরাধ, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ পরিবর্তনের মতো নানা প্রশ্ন সামনে রেখে লড়াই করে গেছেন। কিন্তু দেশের দু:সাহসী এমনসব বীর নারীদের লড়াইয়ের আখ্যান ও জীবনদর্শন সমাজ কী রাষ্ট্রে নিদারুণভাবে বঞ্চিত ও দলিত।

২.
জানি ইতিহাসগ্রন্থনের প্রচলিত প্রকল্প লিঙ্গ ও জাত্যঅভিমানী। সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া প্রবলভাবে পুরুষালি। তাই আমাদের ঐতিহাসিক সংগ্রামী নারীরা আমাদের ‘জাতীয় প্রতীক’ হিসেবে অস্বীকৃত থাকেন। সমাজ ও রাষ্ট্র নারীদের ‘আইকনিক’ চরিত্র হিসেবে মান্য করতে অভ্যস্থ নয়। কিন্তু এই লিঙ্গভিমানী সমাজবাস্তবতাতেই এক আশাজাগানিয়া উদাহরণও আছে। বাংলাদেশের হাজং আদিবাসী সমাজ রাশিমনি হাজংকে নিজেদের এক ‘আইকনিক’ চরিত্র হিসেবে মান্য করে চলেছেন। এটি নি:সন্দেহে বাংলাদেশের মতন এক লিঙ্গভিমানী রাষ্ট্রে এক অতি বিরল নমুনা। কারণ সচারচর আমরা এমন দেখতে পাইনা কোনো নারী চরিত্রকে গোটাসমাজ নিজেদের প্রধান স্মরণীয় চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। ২০১৮ সনের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্যে গ্রাম ও নগরের নারীর সক্রিয় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ‘উইমেন অ্যাক্টিভিস্টদের’ দায়িত্বকে নতুনভাবে সম্মাননা জানানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কী নারী অ্যাক্টিভিস্টদের মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারছে? পারেনি, বলা ভাল চেষ্টাও করেনি। লিঙ্গঅভিমানী এই রাষ্ট্র হয়তো দেশের সকল অঞ্চলের প্রতিজন নারীর প্রতিদিনের লড়াইকে সমমর্যাদা জানাবে না, কিন্তু অধিকার আন্দোলনে তুলনামূলকভাবে পাবলিক নারী অ্যাক্টিভিস্টরাও কিন্তু একইভাবে অস্বীকৃত। কিন্তু এই দেশেই হাজং জাতি পেরেছেন, রাশিমনির মতো একজন বীর নারীকে সামাজিক মর্যাদা দিয়ে গ্রহণ করেছেন।

৩.
হাজং সমাজে রাশিমনি হাজংয়ের এই পাবলিক আত্তীকরণ আজকের লিঙ্গদেমাগী ব্যবস্থায় আমাদের নয়া আশা জাগাতে পারে। জাত্যাভিমানী বাঙালি রাষ্ট্রে রাশিমনি হাজংয়ের এই শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত আমাদের লিঙ্গীয়-বৈষম্য দূরীকরণ সহায়ক হতে পারে। দেশে নিজেদের যারা পরিচয় দেন ‘নারীনেত্রী’, ‘নারী সংগঠক’, ‘নারী অধিকারকর্মি, ‘নারীকর্মী’, ‘নারীবাদী’, ‘জেন্ডার বিশেষজ্ঞ’ কিংবা ‘উইমেন অ্যাক্টিভিস্ট’ হিসেবে তারা নিশ্চয়ই রাশিমনি হাজংয়ের সামাজিক স্বীকৃতিকে পাঠ করেছেন বিস্তর। কিন্তু একজন নারী কীভাবে কোনো সমাজের পাবলিক আইকনে পরিণত হয়ে ওঠেন আমাদের অ্যাক্টিভিস্টরা কী হাজং সমাজের সেই শক্তি বোঝার চেষ্টা করেছেন? স্মরণ রাখা জরুরি হাজং সমাজও পুরুষতান্ত্রিক, তবে এখানে ব্যক্তির নিকনী বা গোত্র পরিচয় শুধুমাত্র মাতৃসূত্রীয় ধারায় বাহিত হয়। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা হয়েও হাজং সমাজ পেরেছে। রাশিমনি হাজংকে নিজেদের এক সাহসী পরিচয় হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। দেশের গ্রাম কি শহর বাঙালি সমাজে আমরা এমন কোনো চর্চা দেখতে পাই কী? এমনি এমনি তো আর রাশিমনি হাজং বৃহৎ হাজং সমাজের পাবলিক আইকন হয়ে ওঠেননি। তাঁর দর্শন, সংগ্রাম ও দায়িত্বশীলতাই তাঁকে হাজং সমাজে অনুকরণীয় করে তুলেছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের মান্দি আদিবাসীদের কাছে মিজি মৃ কিংবা রাঙামাটির চাকমা সমাজে রানী বিনীতা রায়ের সামাজিক স্বীকৃতিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কোনোভাবেই তা হাজং সমাজে রাশিমনি হাজংয়ের মতো নয়।

৪.
আজ যখন আমরা লিঙ্গীয় বৈষম্য, নারীর অধিকার, জেন্ডার বৈচিত্র্য ও ন্যায্যতা, ধর্ষণ ও যৌননিপীড়ন বিষয়ে নিজেদের যারপরনাই সোচ্চার ও সক্রিয় মনে করছি, এই আমরাই বারবার এ সম্পর্কিত নি¤œবর্গীয় প্রতিরোধী বয়ানগুলোকে আড়ালে রেখেই নিজেদের একতরফা ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ চরিত্র দাঁড় করাচ্ছি। অথচ আমরা একজন নারীকে নিজেদের সমাজে পাবলিক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। হাজংরা পেরেছেন। কারণ রাশিমনি নিজেই হাজংদের সামাজিক মনস্তত্ত্বে সেই দর্শন ও শিক্ষার বানা (হাজং তাঁত) সচল করে গেছেন। রাশিমনির এই দর্শন লিঙ্গীয় আত্মপরিচয়ের রাজনৈতিক ভিত, এই শিক্ষা জেন্ডার ডিসকোর্সের মূল প্রশ্ন। রাশিমনি নারীর উপর রাষ্ট্রীয় পুরুষালি যৌনসহিংসতাকে জীবন দিয়ে প্রশ্ন করে গেছেন। একক ও বিচ্ছিন্নভাবে নয়, রাশিমনি নারীর উপর সহিংসতা রুখতে সমাজকে লড়াইয়ের ময়দানে হাজির করেছেন। প্রায় বাহাত্তর বছর আগে লিঙ্গীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠিত ‘হাজং বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত এই জনসংগ্রামে কেবল ১২ জন জীবনই দেননি, গোটা হাজং সমাজ নারীর অবদানকে সামাজিক স্বীকৃতিদানের শিক্ষাটিও সেখান থেকেই জোরালো করেছিল। আর তাই হাজং সমাজ দারুণ গর্বে রাশিমনিকে ‘হাজংমাও (হাজংমাতা)’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের সামাজিক বীর নেতা হিসেবে ঘোষণা করতে পেরেছে।

৫.
‘হাজং বিদ্রোহের’ আরেক বীর নেত্রকোণার দূর্গাপুর এলাকার কুমুদিনী হাজং। ১৯৩৭ সন থেকে শুরু হওয়া অন্যায় টংকপ্রথা বিরোধী আন্দোলনে কুমুদিনী ও তাঁর স্বামী লংকেশ্বর উভয়েই জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৬ সালে ৩১ জানুয়ারী সকাল দশটার দিকে বিরিশিরি থেকে সিমসাং নদী পাড়ি দিয়ে ৪ মাইল উত্তর-পশ্চিমে বহেরাতলী গ্রামে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনীর একটি সশস্ত্র দল লংকেশ্বর হাজংকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য কুমুদিনীদের বাড়ী আক্রমণ করে। লংকেশ্বরকে না পেয়ে আক্রমণকারীরা কুমুদিনীর উপর যৌনসহিংস আক্রমণ চালায়। রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর যৌনসহিংসতার বিরুদ্ধে গ্রামের নারী-পুরুষদের নিয়ে জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলেন রাশিমনি হাজং। ঐ দিনই সশস্ত্র রাইফেলসের গুলিতে শহীন হন রাশিমনি হাজং, দিস্তামনি হাজং, বাসন্তি হাজং সহ প্রায় ১২ জন লড়াকু হাজং বীর। রাশিমনির রাজনৈতিক চৈতন্য ও আত্মত্যাগ হাজং সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক বিনির্মাণে সাহসী ভূমিকা রেখেছে।


কুমুদিনীকে চারদিক থেকে যখন সশস্ত্র পুরুষেরা হামলা করেছে তখন রাশিমনি গ্রামের সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানান। হাজং রাওয়ে (ভাষায়) রাশিমনি ডাক দেন, ‘ময় তিমাদ, তিমৗদলৗ মান ময় রুক্ষা কুরিব না-তে মরিব, তুরা তুমলৗ নীতি নিয়ৗ বুইয়ৗ থাক’। এর বাংলা মানে এরকম, আমি একজন নারী, নারী হয়ে নারীর মান রক্ষা করব-না হয় মরব, তোমরা তোমাদের নীতি নিয়ে বসে থাক। আজ যখন চারদিকে সমতল থেকে পাহাড়, শিক্ষালয় থেকে পুলিশি হেফাজত কোথাও ধর্ষণসহ যৌনসহিংসতা থামছে না তখন রাশিমনির সাহসী আওয়াজ গুমগুম করে। আমরা আর কতকাল নিজেদের ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ আর সুশীল নীতি নিয়ে বসে থাকব? যৌননিপীড়নের বিরুদ্ধে কেউ কী ভেতর থেকে দেবে ডাক একজন রাশিমনির মতো নিজের ভাষায়, নিজের সাহসী উচ্চারণে।

………………………………………………………………
লেখক ও গবেষক। ই-মেইল: [email protected]