১.
যশোর সড়কের গাছ কাটা নিয়ে তর্ক শুরু হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং যশোর জেলা পরিষদ গাছ কেটে মহাসড়ক সংস্কার করতে চায়। অন্যদিকে বৃক্ষপ্রেমী, পরিবেশবাদী, প্রতিবাদী, সংস্কৃতিকর্মী, লেখক, পেশাজীবী, গবেষকেরা গাছ না কেটে সড়ক সংস্কার চায়। তুমুল তর্কের এক পর্যায়ে আদালত গাছ না কাটা বিষয়ে ৬ মাস নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বিবরণ ও উপস্থাপনে ভিন্নতা থাকলেও যশোর রোডের এই গাছ কাটা এবং গাছ কাটার প্রতিবাদ একই প্রতিবেশ-দর্শনের পাটাতন হাজির করেছে। আচরণগত ভিন্নতা থাকলেও এই গাছ কাটা না কাটা প্রায় সব বিবেচেনায় প্রবলভাবে ‘মানুষকেন্দ্রিক (এথনোসেন্ট্রিক)’। এখানে উভয়পক্ষই মানুষকে কেন্দ্রে রেখে গাছ কাটতে বা গাছ রাখতে চাচ্ছেন। উভয়পক্ষের মনোজগত মূলত ঘিরে আছে কয়েক হাজার ‘বৃষ্টিগাছ (মহাশিরীষ)’। সরকারপক্ষ মানুষের জন্যই এই গাছগুলো কেটে রাস্তা সংস্কার চান। প্রতিবাদী নাগরিকপক্ষ এই গাছগুলো সুরক্ষায় মূলত মানুষের স্মৃতি ও আকাংখাকেই প্রতিষ্ঠিত করে চলেছেন। যশোর রোডের গাছ কাটা নিয়ে উভয়পক্ষের চিন্তাগুলো ‘মানুষকেন্দ্রিক’, ‘তত্ত্বাবধায়ন’ এবং ‘প্রাণকেন্দ্রিক’ মতবাদকে সমর্থন করে। গাছ কাটার পক্ষ এবং বিপক্ষ উভয়েই মানুষের যাপিতজীবনের চশমায় বিষয়টিকে দেখে চলেছেন। যদিও প্রতিবাদীপক্ষের চিন্তায় কখনো কখনো ‘তত্ত্বাবধায়ন মতবাদ’ এবং এমনকি ‘প্রাণকেন্দ্রিক মতবাদও’ ঝিলিক দিয়ে ওঠছে। গাছ সুরক্ষায় মানুষকে কেন্দ্রে রেখে দেখলে প্রতিবাদীপক্ষ নিজেদের এই গাছের মালিক মনে করেন না, কিন্তু তারা মানুষ হিসেবে এর তত্ত্বাবধায়ন করতে চান। অপরদিকে সকল প্রাণের টিকে থাকার অধিকার হিসেবে গাছগুলোরও বেঁচে থাকার শর্তও সামনে টানছেন অনেকে। আর এই ‘প্রাণকেন্দ্রিক চিন্তাও’ কেবলমাত্র শতবর্ষী কিছু বৃক্ষের বেঁচে থাকাকেই শেষমেষ সমর্থন করে, কোনোভাবেই এই গাছগুলো ঘিরে গড়ে ওঠা এক বৈচিত্র্যময় বাস্তুসংস্থানের সকল প্রাণের সমানভাবে বেঁচে থাকাকে নয়। কারণ প্রশ্ন ওঠেছে যশোর রোডের ২ হাজার ৩১২টি মূলত মহাশিরীষ বৃক্ষের জীবন নিয়ে। এই গাছগুলোর বয়স নিয়ে এবং এই গাছের সাথে মুক্তিযুদ্ধসহ মানুষের নানা স্মৃতি ও উপকার নিয়ে। এই গাছগুলোতে শত বছর ধরে আবাস গড়ে তুলেছে নানা ফার্ণ, ছত্রাক, শৈবাল, মস, লাইকেন, পতঙ্গ, পাখি ও বৈচিত্র্যময় গুল্ম। এই ফার্ণ ও গুল্মদের জীবন থেকে কী কখনো এরকম গাছকাটা তর্ককে আমরা দেখার চেষ্টা করেছি? মূলত যারা সেখানকার আদিবাসিন্দা, আদি বসতিস্থাপনকারী। গাছ মানুষকে নিঃশ্বাস, খাদ্য, ছায়া, সৌন্দর্য আর ছায়া জোগায় তাই গাছ কাটা যাবে না। আবার মানুষ গাছ রোপণ ও পরিচর্যা করতে পারে তাই প্রয়োজনে গাছ কাটা যাবে। গাছ কাটা না কাটার এই তুমুলতর্কে বারবার আমাদের সামনে আসে মূলত বৃক্ষ, মানে বড় গাছ। ফার্ণ কী লতাগুল্মরা বরাবরই এ ধরণের চিন্তাপ্রক্রিয়ায় আড়ালে থেকে যায়, যাদের জীবন হয়ে ওঠে আরো প্রান্তিক ও বিপন্ন। ওসমানী উদ্যানের ৩৩ হাজার গাছ কাটা থেকে শুরু করে সমকালের যশোর রোডের গাছ কাটা বিতর্কের সবজায়গাতেই তীব্র ও কঠোর ‘মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি’ বহাল আছে। প্রশ্ন হলো কেন এমন হয়? মূলতঃ করপোরেট সমাজে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক আচরণগুলোই পক্ষ কী বিপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করে দেয়। আর সেখান থেকেই মানুষের সমাজের প্রশ্নহীন ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, বাঙালি-আদিবাসীর মতো সামাজিক শ্রেণিবিভাজনের ছকেই মানুষ বৃক্ষের সমাজকে চুরমার করে ফেলে। মানুষের শ্রেণিবৈষম্যের চশমায় যশোর রোডের বৃক্ষ-বাস্তুসংস্থানের সমাজও শ্রেণিবিভক্ত হয়ে পড়ে। ফার্ণ, পাখি, পতঙ্গ, গুল্মের জীবন বাতিল হয়ে সেখানে কেবলমাত্র কয়েক হাজার বৃক্ষের জীবনই পক্ষ কী বিপক্ষের তর্কের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। চলতি আলাপখানি মূলত যশোর রোডের এই সাম্প্রতিক গাছ কাটা বিতর্কের প্রশ্নহীন দার্শনিকতাকে বুঝতে চায়। মানুষকেন্দ্রিকতার প্রবলতা থেকে বেরিয়ে ২,৩১২টি বৃক্ষ নয়, এখানকার জটিল বাস্তুসংস্থানের জীবন থেকে এই প্রক্রিয়াকে দেখতে চায়।
২.
স্থাননামের দেশীয়রীতি অনুযায়ী যশোর রোডের কত যে নাম। যশোরের প্রবীণজনের স্মৃতিতে এই সড়ক ‘কালী বাবুর রাস্তা’ হিসেবেও পরিচিত। তাদের ভাষ্য, যশোহরের জমিদার কালী প্রসন্ন রায় চৌধুরী (কালী পোদ্দার) বাংলাদেশের যশোর থেকে বর্তমান ভারতের নদীয়ার গঙ্গাঘাট পর্যন্ত ৮০ কি.মি. এই রাস্তা তৈরি করেন। মা যেন গাছের ছায়ায় ছায়ায় গঙ্গাস্নানে যেতে পারেন এ কারণে রাস্তার দু’পাশে মূলত মহাশিরীষ গাছের চারা রোপণ করেন কালী বাবু। ইতোমধ্যে এই গাছেদের অনেকেই ১৭০ বছর পাড় করেছে। সড়কের পাশে কোথাও প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিয়ে বট ও শিমূল বৃক্ষ। পাশাপাশি সড়ক ও জনপথ বিভাগ যশোর রোডের পাশে মেগহনি, বাবলা, খয়ের, কড়ই, একাশিয়া, শিশু, আম, কাঁঠাল, সেগুন ও দেবদারু গাছও লাগিয়েছে। এসব গাছের অনেকেই শত বছর ধরে বাংলাদেশের নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির স্বাক্ষী। দেখেছে মুঘল সা¤্রাজ্য, উপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন, ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহ, দেশভাগ, বঙ্গভঙ্গ, দাঙ্গা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কী স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। প্রাকৃতিক বিপর্যয় কী শারীরবৃত্তীয়ভাবে নানাসময়ে কিছু গাছের মৃত্যু হলেও উন্নয়নের নামে ২০১৩ সনের আগষ্ট মাসে যশোর রোডের ৭৫টি গাছ কাটার প্রথম সিদ্ধান্ত নেয় যশোর জেলা পরিষদ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ। পরবর্তীতে এই গাছ কাটার রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত আরো প্রবল হয়ে ওঠে। যশোর-খুলনা মহাসড়কের যশোর অংশের ৩৮ কি.মি. এবং যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ৩৮ দশমিক ২০০ কি.মি. পুননির্মাণের জন্য ৩২১ কোটি ৫৬ লাখ ১৮ হাজার টাকা এবং ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা (মোট ৬৫০ কোটি ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকা) ব্যয়ে দুটি প্রকল্প গ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এর ফলে যশোর-খুলনা মহাসড়কে ২ হাজার ৫৫৫টি গাছ এবং যশোর-বেনাপোল সড়কে ২ হাজার ৩১২টি গাছ (মোট ৪ হাজার ৮৬৭টি গাছ) কাটা পড়বে। প্রকল্প দুটি ২০১৭ সনের মার্চ মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদিত হয়। মহাসড়ক পুননির্মাণের জন্য যশোর রোডের গাছ কাটার বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিবাদের মুখে ২০১৭ সনের ১৩ জুলাই গাছ না কেটে সড়ক সংস্কারের ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু সেই ঘোষণাকে গুরুত্ব দিয়ে ২০১৭ সনের ১৭ আগষ্ট দরপত্র আহবান করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এটি দরপত্র ক্রয়-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আছে। এর ভেতর ‘নাটকীয়ভাবে’ সরকারের পূর্বতন গাছ না কাটার সিদ্ধান্ত গুরুত্ব না দিয়ে ২০১৮ সনের ৬ জানুয়ারি যশোর জেলা প্রশাসনের সভাকক্ষে ‘যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক যথাযথ মানে ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় রাস্তার দুই পাশের গাছসমূহ অপসারণ’ শীর্ষক সভায় গাছ কেটে সড়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হয়। ২০১৯ সনের ৩১ ডিসেম্বরের ভেতর এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। গাছ না কেটে যশোর রোড উন্নয়নের দাবি জানিয়ে শুরু হয়েছে জনআন্দোলন। আদালত গাছ না কাটার ক্ষেত্রে ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে। যশোর রোডের এই গাছ কাটা বিতর্ক আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দার্শনিক ও নীতিপ্রশ্নওকে হাজির করেছে। গাছ কিংবা বৃক্ষবাস্তুসংস্থানকে আমরা কীভাবে বিবেচনা করবো? শতবর্ষী বা স্মৃতিময় গাছ সণাক্তকরণ কী সংরক্ষণ বিষয়ে আমাদের নীতি ও আইন কেমন হবে? গাছের জীবনমরণ কী শুধুই জনআন্দোলন, আদালত বা সরকারের কোনো কোনো উন্নয়নচিন্তায় বন্দী হয়ে থাকবে? এই মাটিই তো দুনিয়াকে জানিয়েছে গাছের জীবন আছে, গাছ ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে, ঘুমিয়ে পড়ে। নিদারুণভাবে এই মাটিরই কোনো না কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাবিদেরা ১৭০ বছরের প্রবীণ গাছদের খুন করে রাস্তা বানাবার চিন্তা করেন।
৩.
মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত যশোর রোডের ২,৩১২টি বৃহৎ বৃক্ষের কথা চলতি আলাপ তুলছে না। এই গাছ ঘিরে গড়ে ওঠা অপরাপর প্রাণসত্তার আহাজারির চশমায় পুরো প্রক্রিয়াকে পাঠ করতে চাইছে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত যশোর রোডের মূলত প্রবীণ মহাশিরীষ (রেইনট্রি) গাছগুলো কী শুধুই এক একটি সংখ্যামাত্র? ধরে নিচ্ছি সড়ক উন্নয়নের জন্য সকল কিছু উপক্ষো করে গাছগুলো কাটতে হবে, কিন্তু তাতে কী সরকারের সংখ্যা হিসেবে মাত্র কয়েক হাজার বৃক্ষেরই মৃত্যু হবে? কোনোভাবেই তা নয়। কারণ এই গাছগুলো ইতোমধ্যেই এক একটি বৃক্ষ-বাস্তুসংস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি গাছ ঘিরে গড়ে ওঠেছে নানা খাদ্য-শৃংখল ও সবমিলিয়ে এই সড়কে তৈরি হয়েছে এক জটিল খাদ্যজাল। সংখ্যায় যত গাছই কাটা হোক না কেন তাতে আহত ও নিহত হবে আরো লাখো নিযুত প্রাণ। সড়ক ও জনপথ বিভাগ ২,৩১২টি বৃক্ষ কাটতে চাইছে, কিন্তু এই গাছেদের উপর তৈরি হওয়া বাস্তুসংস্থানকে সে কী কোনোভাবেই ওলটপালট করতে পারে? এইসব গাছে বসবাসকারী ফার্ণ, শৈবাল, মস, ছত্রাক, গুল্ম, লাইকেন, পতঙ্গ ও পাখিদের কী সে খুন করতে পারে? বা কোনো নিরাপদ পুনর্বাসন ছাড়াই উচ্ছেদ করতে পারে? তাহলে প্রশ্নটা কেন শুধুমাত্র সংখ্যা হিসেবে ২,৩১২টি বৃক্ষ? এখানে তো প্রশ্নহীনভাবে খুন হতে যাচ্ছে লাখো লাখো জীবিত প্রাণ। আমরা কী একটিবারও প্রকৃতির এই প্রাণসত্তার কথা ভাববো না? আমরা কী সকল উন্নয়ন কেবলমাত্র অধিপতি মানুষের চশমায় দেখতে থাকবো? তাহলে জীবজগত কী জগতসংসার বিকশিত হবে কীভাবে? কোন জাদুকরী বিদ্যা বা ক্ষমতার চেরাগ মানুষকে ফার্ণ, শৈবাল, ছত্রাক, পতঙ্গ বা পাখিদের সম্পর্ক ছিন্ন করে বাঁচাতে পারবে?

৪.
যশোর রোডের মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত প্রবীণ গাছগুলোতে সবচে’ বেশি দেখা যায় বাস্কেট ফার্ণ। যশোর-সাতক্ষীরা অ লে এই ফার্ণটি চিলে গাছ নামে পরিচিত। মূলত প্রবীণ মহাশিরীষ গাছের কান্ড-বাকলই এই ফার্ণদের বসবাসের প্রিয় জায়গা। উদ্ভিদতাত্ত্বিকভাবে Drynaria roosii Ges Drynaria quercifolia নামে পরিচিত এই ফার্ণ বিশ্বব্যাপী চিকিৎসায় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় বিপদের মুখে। বাংলাদেশও প্রবীণ বৃহৎ বৃক্ষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এই ফার্ণের বিস্তার হুমকীর মুখে। দেশে একক আয়তনের কোনো অঞ্চলে যশোর রোডেই এই চিলে গাছের আধিক্য বেশি, এর কারণ একটি একক জায়গায় দেশের আর কোথাও এত প্রবীণ মহাশিরীষ গাছ একসাথে নাই। চিলে গাছ সাতক্ষীরা-খুলনাতে নয়নাপাতা নামেও পরিচিত। দেশের অনেক জায়গায় গাছটি গরুরপাখা বা পাখিরাজ নামে পরিচিত। আদিবাসী হাজংয়েরা একে ডাকে গরুরপংখি, মান্দিরা বলে দুরাংজাসি, চাকমারা চিলো বাচা, মারমারা ফুলুরেরে নামে ডাকে। দেশব্যাপি মানুষের সমাজে এর নানা ব্যবহার, তবে এর শুকনো পাতা দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো প্রায় অঞ্চলেই শিশুদের পছন্দ। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় এই গাছের গুরুত্ব অনেক। চাকমারা আমাশয় হলে এর রাইজোম পিষে খায়। মারমারা পস্রাবে জ্বালাপোড়া কমাতে এর রাইজোম রস ব্যবহার করে। তঞ্চংগ্যারা এর কচি পাতার রস বুক ব্যথায় ব্যবহার করে। মান্দি সমাজে এই গাছের কন্দের রস হাড় ব্যথায় ব্যবহৃত হয়। কৃমিনাশক হিসেবেও এই গাছের রস অনেকে ব্যবহার করে। হাজংরা বিশ্বাস করে এই গাছ পবিত্র, কারণ রামায়ণে বর্ণিত পৌরাণিক পাখি গরুড়ের পাখনা থেকেই এর বড় পাতা গুলো জন্ম নিয়েছে। চৈত্র-বৈশাখ মাসে ঝড়ের আগে হাজংয়েরা এই গাছের শুকনো বড় পাতা নিজেদের ঘরের চালে গেঁথে রাখে যেন ঝড়-বাদল থেকে ঘরবাড়ি রক্ষা পায়। কেবল মানুষ নয় এই ফার্ণ প্রকৃতির অপরাপর সদস্যদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিকভাবে এই ফার্ণের কন্দ অনেক বেশি জলীয়বাষ্প থেকে আর্দ্রতা ধরে রাখে। এর কডি ডগা থেকে বেরুনো রস পিঁপড়া ও মৌমাছিরা খেয়ে বাঁচে। আবার পিঁপড়াদের মাধ্যমে এই ফার্ণের স্পোর (বীজ) এর বিসরণ ঘটে। এভাবেই এই গাছ বংশ থেকে বংশে টিকে থাকার চেষ্টা করে। এই ফার্ণ স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চারদিকের শুকনো পাতা জড়িয়ে একটি ঝুড়ি তৈরি করে। আর তাই চড়–ই, টুনটুনি, হলুদ পাখিসহ অনেকেরই প্রিয় আবাস এই ফার্ণের ঝুড়ি বাসা। যে গাছগুলোতে এই ফার্ণ বেশি সেখানে পাখিরাও বেশি। আজকাল শহর এলাকায় ‘ড্রাই ফ্লাওয়ার’ হিসেবে এই গাছের শুকনো পাতা ঘরসাজানোর জন্য বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। তবে শুধুমাত্র চিলে ফার্ণ নয়, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বৃক্ষগুলোতে এভাবেই আবাস গড়ে তুলেছে অনেক ছত্রাক, মস, লাইকেন, গুল্ম, পতঙ্গ ও পাখিরা। কথা হচ্ছে রাস্তা সংস্কারের নামে আমরা ২,৩১২টি গাছ কাটতেই পারি, কিন্তু বাংলাদেশের ঝুড়ি ফার্ণের এই বৃহৎ আবাসস্থলটিতো ধংস করতে পারিনা। লাখো কোটি মস, শৈবাল, ছত্রাক, পতঙ্গ কী পাখিদের জীবনসংসার উচ্ছেদ করতে পারি না। ফার্ণ, শৈবাল, পতঙ্গ, পাখিদের কোনোধরণের উচ্ছেদ বা নিপীড়ন না রেখে সড়ক ও জনপথ বিভাগ কী পারবে ২,৩১২টি গাছ কাটতে? কারণ রাস্তা সংস্কারের জন্য শুধু কিছু গাছের সংখ্যাকেই তারা হাজির করেছেন। অবশ্যই মানুষ তার প্রয়োজনে গাছ কাটবে কিংবা বাঁচাবে। কিন্তু এর দায়ভার নিরপরাধ প্রকৃতির অপরাপর লাখো জীবনকে সইতে হবে কেন? যখন কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় জমি অধিগ্রহণ করা হয় তখন সেখানকার অধিবাসী মূলত মানুষদের অনুমতি নেয়া হয়, তাদের নানাভাবে পুর্নবাসনের প্রক্রিয়া থাকে। যশোর রোডে যখন গাছ কেটে সড়ক তৈরির পরিকল্পনা চলছে এখানে আমরা আশা করবো এই বৃক্ষ-বাস্তুসংস্থানের অধিবাসীদের অনুমতি নেয়া হোক এবং এখানে বসবাসকারী সকল প্রাণকে নিরাপদে পুর্নবাসন করেই গাছ কাটা হোক। আর সেই প্রক্রিয়া ও কারিগরি যতদিন না পর্যন্ত রপ্ত করা যাচ্ছে ততদিন যশোর রোডের প্রবীণ বৃক্ষগুলো থাকুক। স্মরণে রাখা জরুরি কেবলমাত্র প্রবীণ মহাশিরীষ বৃক্ষই নয়, সবদিক থেকে আড়ালে রাখা এই ফার্ণ কী পাখিরাও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের টগবগে স্মৃতি বহন করে চলেছে।
৫.
যশোর রোডের মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত প্রবীণ গাছগুলি বাংলাদেশের আইনে ‘জাতীয় ঐতিহ্য’ ও ‘স্মারক বৃক্ষ’। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এর ২৩নং ধারা অনুযায়ী সরকার দেশের এমন বৃক্ষগুলি সংরক্ষণ করার কথা। যেসব ঐতিহ্যবাহী, পুরাতন বয়স্ক, দেশীয় ও শতবর্ষী বৃক্ষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রথাগত মূল্য রয়েছে সেসব বৃক্ষ উক্ত আইন অনুযায়ী ‘স্মারক বৃক্ষ’। এছাড়াও এমনতর শতবর্ষী এবং স্মারক বৃক্ষ রক্ষায় ২০১৬ সনে সরকার ‘বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন ২০১৬’ নামে আরো একটি আইন করেছে। ২০১৬ সনের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে মন্ত্রীসভায় উক্ত আইনের খসড়া অনুমোদিত হয়। উক্ত আইনে শতবর্ষী গাছ শুকিয়ে বা মারা গেলেও না কাটার বিধান রাখা হয়েছে। মূলত:বন্যপ্রাণী, পাখির আবাসস্থল মানে প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় এই বৃক্ষদের সংরক্ষণ করতে চায় সরকার। বৃক্ষ আইন লংঘনকারীর জন্য ৫০ হাজার টাকার জরিমানা বা ৩ মাসের জেল বা উভয় দন্ড রাখা হয়েছে। কিন্তু শুধু দলিল বা নথি দিয়ে কী আর এই গাছের জীবন সুরক্ষা পাবে। এর জন্য দরকার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। দরকার মনোজগতের মানুষকেন্দ্রিক উপনিবেশিক চিন্তাগুলোকে দূর করে প্রকৃতির অসীম প্রাণসত্তার সম্পর্কের জায়গা থেকে জীবনকে জানাবোঝার সাহস করা। ইতিহাস থেকে ইতিহাসে অনেকেই সেই স্বাক্ষ্য রেখে গেছেন। রাজার নির্দেশ অমান্য করে খর্জুর গাছ রক্ষায় জীবন দিয়েছিলেন চিপকো আন্দোলনের অমৃতা দেবী। নেত্রকোণার সুসংদূর্গাপুরে শালগাছ কাটার বিরুদ্ধে জীবনবাজি রেখে অজিত রছিল শুরু করেছিলেন মেনকীফান্দা আন্দোলন। সড়ক ও জনপথ বিভাগ চাইলেই পারে, গাছ না কেটে পুরো অ লটিকে মানুষ ও গাছ সকলের জন্যই বিবেচনা করা। গাছ রেখেই তো সড়ক সংস্কার সম্ভব, এর উদাহরণ তে দেশেই আছে। ২০০৮ সনে কক্সবাজারের দক্ষিণ বনবিভাগের আওতাধীন টেকনাফ উপজেলার শিলখালী রেঞ্জের জাহাজপুরা সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে পাকা সড়ক নির্মাণের জন্য প্রায় ৩৬টি প্রবীণ গর্জন বৃক্ষের মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করেছিল স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর। বনবিভাগ গাছ কাটার প্রতিবাদ জানায়। শেষ পর্যন্ত গাছ না কেটেই এই রাস্তাটি তৈরি করা হয়। আমরা সেই রাস্তাটির নির্মাণ কারিগরি এবং সকল পক্ষের অভিজ্ঞতাগুলো জানতে পারি। সড়ক উন্নয়নের আগে আশা করবো নিয়মমত পরিবেশগত সমীক্ষা, প্রাণবৈচিত্র্য সমীক্ষা এবং জনজীবনে প্রভাব যাচাই করবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যশোর রোড থেকে কোনো জীবনকে হত্যা বা উচ্ছেদ করে নয়, বরং জীবনের বৈচিত্র্যকে সুরক্ষা করেই সকলের বিরচণের জন্য তৈরি হোক স্বপ্নের যশোর রোড।
……………………………………………………………………………………………………………..
পাভেল পার্থঃ গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ। [email protected]