কংচাই: পর্যটনের জন্য সাজেকে স্থানীয় জনজাতিদের জমি জবর দখল করা হয়েছে মর্মে প্রবল অভিযোগ আছে। তাতে এবার যোগ হয়েছে সমাধি নিয়ে ক্ষোভ। পলি আর ইসরাত নামের দু-পর্যটক সেখানে বেড়াতে গিয়ে স্থানীয় লুসাই জনজাতির একটি সমাধিতে তাদের নাম বড় বড় অক্ষরে লিখে চলে আসে। সাদা চোখে যার অর্থ দাঁড়ায় সমাধি দখল। নাকি ভুল বললাম। আপনি যখন একজনের নামের উপর আরেকজনের নাম লেখা দেখেন তখন তাকে দখল ছাড়া আর কিইবা বলবেন? চেহারা বইয়ে বিষয়টি নিয়ে নানান আলোচনা-সমালোচনা চোখে পড়ছে কয়েকদিন ধরে। ছবিসহ বিষয়টি প্রথমে উঠে আসে Mir Shawnul Haque (link- https://web.facebook.com/photo.php?…) নামে জনৈক ব্যক্তি’র একটি পোষ্টের মাধ্যমে। ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখের পোষ্ট। আমি তাঁর টাইমলাইনে গিয়ে দেখেছি তিনি ট্রাভেলার্স নামক একটি পেজ এডমিন করেন। মনে হয়েছে তিনি সচেতন একজন ট্রাভেলার। এখানে তিনি ট্যুরিষ্টদেরকে এরূপ কাজ হতে বিরত থেকে স্থানীয় কৃষ্টি-কালচারকে শ্রদ্ধা জানানোর আহবান মূলক, গঠনমুলক কথা বলেন। দেখলাম পোষ্টটাতে সহস্রাধিক রিএ্যাক্ট পড়েছে ইতিমধ্যে। কমেন্টস পড়েছে শতাধিক। আমার পরিচিত কয়েকজন পাহাড়ি বন্ধুও ইতিমধ্যে পোষ্টটি শেয়ার পূর্বক সমালোচা করা হয়েছে। এটিকে আমি প্রথমে তেমন সিরিয়াসলি নেয়নি। আজ সকালে আরেক পরিচিত চেহারা-বই বন্ধু যে কিনা ট্রাভেলিং কমিউনিটিতে অনেকের সুপরিচিত ও পছন্দের ব্যক্তিত্ব Apu Nazrul এ বিষয়ের উপর নানান মানুষের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ সম্পর্কিত কমেন্টস এর স্ক্রিণশট নিয়ে একটি পোষ্ট করেন। স্ক্রিণশটগুলোতে পাহাড়ী কয়েকজন তরুণের ইমোশনাল কিছু মন্তব্য পাওয়া যায় যার সূত্র ধরে পোষ্টটিতে পাহাড়ীদের প্রতি সমতলীয় অনেকের তীক্ষ ও তীর্যক মন্তব্য অনভিপ্রেতরূপে আমার নজর কেড়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে এ্যান্টারটেইমেন্ট জগতের একজন সেলিব্রিটি ডিজে’র ছবিও বর্ণিত সমাধির উপর বসে আহারি ভঙ্গিতে পোষ্টটা কাকতালীয় ভাবে আমার নজরে এসেছে বিধায় বহুল আলোচিত-সমালোচিত সাজেকের সার্বিক ট্যুরিজম ইস্যুকে কত্তাদের কাছে তুলে ধরার প্রয়াসে সাধারণ এই নোটের অবতারণা।
#প্রথম ছবিটা সম্পর্কে যদি বলি, আপনারা এখানে একটা পাথর দেখতে পাচ্ছেন। পাথরটি মাটিতে গাড়ানো। বস্তুত এই পাথরটা শুধুই একখন্ড পাথর নয়। এটা একটা Apitah বা মেমোরিয়াল স্ক্রিপ্টস্টোন। অর্থাৎ একজন মৃত ব্যক্তির স্মরণে ও শ্রদ্ধায় তাঁর জীবন ও প্রয়ানকে ঘিরে সংক্ষিপ্ত কথা লেখা থাকে ওখানে। মৃতব্যক্তির নাম, জন্ম-মৃত্যু তারিখ সহ। এটাই লুসেই জনজাতির কৃষ্টি। এখন ঐ সমতলীয় ২ পর্যটক সেই এপিটাহ্’র মূল লেখার উপর তাদের নাম লিখে চলে আসে। শুধু তাই নয়, এখানে ইংরেজীতে আরো লেখা দেখা যায়-Fuck(ডানদিকে)! আমার যদ্দুর মনে পড়ে, এই এপিটাহটি’র অবস্থান হচ্ছে সাজেকের কংলাক পাড়ায় পাহাড়ের উপর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে যেখান থেকে দাঁড়িয়ে বিশাল কাজালং উপত্যকা ও বাঘাইহাটের ‍সুবিশাল পান্তর দেখা যায়। বেশ নয়নাভিরাম জায়গা।
#২য় ছবিটি আরেকজন পাহাড়ী মন্তব্যকারীর পোষ্ট থেকে নেয়া যিনি এপিটাহ্’কে জুম করে ওখানে মূল লেখা কি ছিল তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ওটাতে মৃতব্যক্তির সম্পর্কে বেশকিছু লেখা আছে সেটা প্রমাণিত হয়।
#৩য় ছবিটি হলো কিছুদিন আগে দেয়া উপরোক্ত সেলিব্রিটি ডিজে’র কভার ফটো যার নাম আমি উল্লেখ করছিনা। আমার মনে হয়েছে এই তারকা সমাধি সম্পর্কে জানতেন না। একারনে আমি চাইনা সিঙ্গেল এই ভুলের জন্য তাঁর ইমেজ নষ্ট হোক। সঙ্গত কারনে তাঁর মুখমন্ডলটাও এডিট করেছি। তবে তাঁর ঐ পোষ্টে আমি ইতিবাচকভাবে সতর্কতামূলক মন্তব্য করেছি যা ব্র্যাকেটে দেয়া হল ( দিদি, কিছু মনে করবেন না। আপনি জানেন কিনা জানিনা, আপনি কিন্তু একজন মানুষের সমাধির উপর বসে আছেন। লুসাই জনজাতিরা মরদেহ কবর দেয়ার পর মাটির উপর মাথার অংশে এই পাথরটা গাড়িয়ে দেই। আপনি সেলিব্রিটি হিসেবে হয়তো স্থানীয় লোকজন ইমোশান দেখায়নি। পরেরবার গেলে স্থানীয় কৃষ্টি কালচার সম্পর্কে ধারনা রাখুন, আপনাকে লোকজন আরো ভালোবাসা দেবে। )
ঘটনাদ্বয়ের তাৎপর্য কি?
২টি ঘটনারই ফলাফল নেতিবাচক ও সাজেকের পর্যটনের জন্য স্থানীয়দের জায়গা অনায্যভাবে দখলের অভিযোগকে বারবার সামনে নিয়ে আসে। আপাতত: উপরোক্ত ঘটনাদ্বয়ের ফলাফল যদি বিশ্লেষন করি, তাহলে আমার ক্ষদ্রজ্ঞানে যা ধরা পড়ে তা নিম্নরূপ তুলে ধরছি:
#এক. পর্যটন উদ্যোগের পর গত কয়েক বছর যাবৎ যেভাবে ট্যুরিষ্টদের যাত্রা এখানে ঘটে, সেভাবে এখানে পর্যটন নীতিমালা প্রণীত হয়েছে কিনা তা বড় প্রশ্নের বিষয়। আমাদের দেশে পর্যটকদের আচরণ কিরূপ সেটা সবারই কম-বেশী জানা। পর্যটন বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে রেগুলেশান তৈরী হয়েছে কিনা সেই প্রশ্নও আসে। আমাদের মনে রাখতে হবে, উক্ত এলাকাটা ২টি ক্লাষ্টারে বিভক্ত। একটা হলো রুইলুই, দ্বীতিয়টি কংলাক। দুটোতেই লুসেই আর ত্রিপুরা জনজাতিদের পাশাপাশি বসবাস। এখানে তারা শত শত বছর বসবাস করে এসেছে আদিবাসী প্রথা মোতাবেক। অধিকাংশ পাহাড়ী মানুষরা জায়গা জমির কাগজপত্র গত ৩০ বছর আগেও আছে কি নেই, দরকার কি নেই সে পাত্তাই দিতোনা। কারন তারা জানতোইনা এভাবে একদিন তারা এ অবস্থার সম্মুখীন হবেন। সবচে বড় কথা হলো, পাহড়ীদের জায়গা জমি ভোগ-দখলের আদি প্রথাটাই হচ্ছে কাগজপত্রহীন। পাড়া প্রধান, মৌজা প্রধানগণই সার্কেল চিফ এর পক্ষ থেকে কোথায় কে চাষাবাদ করবে না করবে তা ঠিক করে দিতেন। ১৯০০ সালে প্রণীত Chittagong Hill Tracts Regulation-এ এসব কথা উল্লেখ আছে। একজনের ভোগ দখলীয় জায়গায় কেউ কখনো হাত দিতনা। দখলীয় সম্পর্কিত সমস্যা হলে তা প্রথা মোতাবেক সুরাহা করা হতো। এই প্রথাটা শুধু এখানে নই, আমি দেখেছি উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ সহ অনেক জায়গায় এখনো প্রচলিত আছে। জুমচাষ নির্ভর এই মানুষজন যেখানে জুমচাষ করত সেখানে/ঐ এলাকায় সবাই একসাথে করত। ওটা ছিল এক ধরনের কমিউন সিস্টেম। তদুপরি একটা সময়ে নিরাপত্তা বা অন্যবিধ কারনে পাহাড়ীরা নির্দিষ্ট জায়গায় বসবাস করে পাড়া প্রথা গড়ে তুলেছিলো অনেক আগে। তবে বৃটিশদের শাসণামলে এরূপ স্থায়ী পাড়া প্রথাটি পোক্তরূপে বেড়ে যায় বলে লোকমুখে প্রকাশ। সেরকম দুটি পাড়া বা ক্লাষ্টার হলো সাজেক ইউনিয়নের এই রুইলুই ও কংলাক। একসময় জায়গাটি অনেক গহীণ জংগলাকীর্ণ ছিল। হাজার প্রজাতির বন-বনানি ও জীবজন্তুতে ভরা পরিপূর্ণ প্রতিবেশ ব্যবস্থা ছিলো বলে জানা যাই। লুসেই ও ওখানকার ত্রিপুরা ক্ল্যানরা (রিয়াং অথবা উসুই) চাকমা বা মারমাদের চাইতেও তুলনামূলকভাবে বেশী নিভৃতপ্রিয় জাতি। এঁরা ম্রো, খুমিদের মতন দূর্গম ও বিচ্ছন্ন এলাকায় বসবাস করে থাকে। আমরা ভালো বা মন্দ যাই বলিনা কেন, এটাই তাঁদের প্রকৃতি, এটাই তাঁদের আচার ও ভালোলাগা। নিভৃতে বসবাসই তাঁদের প্রিয় রীতি। আমি যখন প্রথমবার ঐ এলাকা পরিদর্শণ করি, ২০১১ সাল, তখনো পিচঢালা পথ হয়নি। ইট বিছানোর কাজ চলছিলো। আমি তখন তাঁদের সাথে আলাপ করে জেনেছি তাঁরা খুব ভয়ে ছিলেন। কারন তাঁদের বাড়ীর উপরেই রিসোর্ট হবে সেটা তারা চাইনি। কিন্তু তারা জোর গলায় সেনাবাহিনীকে বলতেও ভয় পেতো যে এ ব্যবস্থা তাঁদের জীবনাচরণের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁদের চোখ-মুখ বলছিল, তাঁরা তাঁদের জীবন প্রথা নিয়ে শংকিত। এমন একটা জায়গায় শেষাবধি পর্যটনের বিশাল জাল বিস্তৃত হলো কয়েক বছরের মধ্যে। শেষবার আমি গিয়েছি ২০১৫ সালের আগষ্ট মাসে। তখন পিচঢালা কাজ শেষ হয়েছে, কয়েকটি পশ ও তারকামানের কটেজসহ রেষ্টুরেনাদিও সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিলো। ২রাত দুদিন থেকেছি। মানুষের সাথে কথা বলেছি। আমি কিন্তু বেড়ানোর জন্য যায়নি, প্রকৃতি দেখতে ও ওখানকার জীবন দেখতেই গিয়েছি। দেখলাম ২০১১ সালে দেখা রুইলুই হেডম্যানের কাঠবিছানো বাড়ীটা আর সহজে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তার সামনেই দোকান রেস্তোঁরা বসে গেছে। পূর্বঢালে ত্রিপুরা পাড়ার খোঁজে নেমে বিফল হলাম। ওঁরা আর সে জায়গায় নেই। তাদের সবাইকেই উত্তরে হেলিপ্যাডের দিকে যাওয়ার রাস্তার দু-ধারে লাইন করে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকার রং মুড়িয়ে নতুন ছোট ছোট ঘর তুলে নতুন আবাস করা হয়েছে। দেখতে যেন মনে হয়েছে ওঁদেরকে ইউনিফর্মড করা হয়েছে। ২০১১ সালে আমি যখন গিয়েছি, তখন ত্রিপুরা পাড়ায় গিয়ে তাঁদের সাথে আলাপ করেছি। তাঁদের বাড়ির উঠোন বা কাছাকাছি এলাকায় নারীদের দেখেছি কোমর তাঁতে কাপড় বুনতে। একাধিক নারীর গল্প করতে করতে, বুনন কাজ তৈরী করতে দেখেছি জাম্বুরা গাছের তলায়। গরীব হলেও কোনো কোনো ভাঙ্গাচোরা বাঁশের ঘরের সামনে গাঁদা ও মালতী জাতীয় ফুলের গাছ দেখেছি। বাড়ীর চারিপাস কলাগাছ ও শাক-সব্জির বাগান ছিল। এখন ওগুলো সব নেই। রাস্তার ধারে তুলে দেয়ার পরও ২০১৫ সালে কারো কারো ঘরের সামনে রাস্তা লাগোয়া যতটুকু খোলা জায়গা আছে সেখানে ত্রিপুরা রমণীদের তাঁতের কাজ করতে দেখেছি। তবে তাদের চোখ মুখ আগের মতন উচ্ছাস মনে হয়নি, মলিণ হয়ে গেছে। প্রাত: সকালে দুজন ত্রিপুরা পাড়াবাসীকে দেখেছি নতুন রাস্তার উপর ময়লা ও গাছের পাতা পরিস্কার করতে। লালচালা কটেজটির দক্ষিণ মোড়ের মাঝখানে। তাদেরকে সহ মোট ৮জন পাড়াবাসীকে সেনাবাহিনী পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে চাকুরী দিয়েছে বলল। ঐ মোড়ের পূর্বদিকে ঢালু জায়গায় একজনকে দেখেছি বিশাল মরাগাছ থেকে কুড়াল দিয়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে লাকড়ি সংগ্রহ করছে। তার উপরেই রাস্তার পশ্চিম অংশে ছিলো একটা সেন্ট্রি। ওখানে বিশাল একটা মা-গাছও ছিল, সম্ভবত ঔষধি গাছ। এখন ঐগাছটি আর আছে কিনা জানিনা। সকালের সূর্য ওঠার আগেই কিশোর-কিশোরী-নারীদেরকে খুব তাড়াহুড়ো করে দুর নিচের ঝর্ণা থেকে জল সংগ্রহ করতে দেখেছি। যারা খেয়াল করেনা তারা হয়তো জানবেনা কিসের জন্য তারা জল তোলার কাজটা তাড়াহুড়ো করছিল। আমি কিন্তু জানি। কারণ বেলা উঠে গেলে যখন পর্যটকের আনাগোনা বেড়ে যাবে, তখন তাদেরকে দেখলে লম্বা লম্বা লেন্স নিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে সবাই। এসব তাদের কাছে খুব লজ্জার বিষয়। প্রতিবাদ করলে হয়তো অনাকাঙ্খিত ঝগড়া শুরু হবে। রাতে হেডম্যানের পাশের এক লুসেই জাতির রেষ্টুরেন্টে চা খেতে গিয়ে ত্রিপুরাসহ আরো কয়েকজনের সাথে গপ্প করছিলা্ম। জীবন জীবিকার ভালো মন্দ আলাপ হলো। তারা স্বীকার করেছে, ট্যুরিষ্টরা আসায় তাদের কয়েকটি পরিবার যারা দোকান দিতে পেরেছে, তাদের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছল্যতা একটু বেড়েছে তবে গোটা সমাজ ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে সেখানে নতুন ঈর্ষা জাগানিয়া গল্পও তৈরী হয়েছে। কারন এখন চোখের সামনেই কেউ কেউ ভালো উপার্জন করছেন আর কেউ হয়তো বঞ্চিত হচ্ছে অথবা মনে করছে। এক তরুণ কথা প্রসঙ্গে তার মনের উষ্মা কিন্তু প্রকাশ করেছে এভাবে, ‘‘যে যাই বলুক আমার কিন্তু মোটে্‌ই ভালো লাগছেনা। আমরা হইচই অপ্রিয় মানুষ, এখন প্রতিদিন সিজনে শত শত –হাজার হাজার মানুষ আসে, কেউ কেউ হুদা আমাদের ঘরে প্রবেশ করতে চাই, আমরা কি তরকারী রান্না করলাম সেগুলো দেখতে চাই, জানতে চাই আমরা কি খাই। এমনকি আমাদের কিশোরী, রমণীরা যখন পায়খানা -পস্রাব করতে যাই, তখনো কেউ কেউ দুর থেকে ক্যামেরায় ছবি তুলে। এখানে মোটেই আর ভালো লাগেনা। জানিনা আর কতদিন থাকতে পারবো।’’ উপরের দিকে উঠে ২০১১ সালে দেখা ভাঙ্গাচোরা জুনিয়র হাইস্কুলটা কিন্তু পোজপাজ হয়ে গেছে। জেনেছি ওটাও নাকি সেনাবাহিনীই করে দিয়েছে। মনে মনে বলেছি, এটা কিন্তু ভালো কাজ হয়েছে।
এখন জনৈক তরুণের ২ বছর আগের উষ্মা প্রকাশের সাথে উপরে দেয়া কবরের পাথর তথা সমাধির উপর বসে ছবি তোলা, নাম লেখা ইত্যাদি যদি মিলিয়ে নেন, তবে কি নোটটার টাইটেল অনভিপ্রেত?
#দুই: এখানে স্মর্তব্য যে, গতমাসে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি’র সংবাদ দাতা মি. হিমেল চাকমা রুইলুই ও কংলাক গিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যার লিংকটা এখানে দেয়া হলো- https://www.youtube.com/watch?v=nEQ… । এখানে কংলাক পাড়ার লুসে্ই হেডম্যানের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, আগের দেড় শতাধিক পরিবারের মধ্যে বাকী আছে ২০ পরিবারের মতন মাত্র।
#তিন: আমি একটু ভবঘুরে টাইপের মানুষ। বেড়ানো আমার পছন্দ। সময় সাধ্য থাকলে কাছে পিছের দেশের বন-বাঁদারে গিয়েও মাঝে মাঝে পড়ে থাকি। মানুষের কৃষ্টি, ইতিহাস জানতে ভালো লাগে। তেমনি এক ঘটনা হলো ২০১৬ সালে। মিজোরাম পরিভ্রমণের সময় আইজলের বইয়ের দোকান গুলো একপ্লোর করছিলাম ক্যাপ্টেন টি এইচ লিউইনের কয়েকটি বইয়ের জন্য। ক্যাপ্টেন লুইন ছিলেন বৃটিশ ভারতের পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ডিসি তথা ডেপুটি কমিশনার। তৎকালীন নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, আরাকান, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর নানান বর্ণনামূলক একাধিক বই তিনি লিখেছেন। লন্ডন ফিরে যাবার আগে এই সাদা মানুষটি মিজোরামে ৯টি বছর কাটাই মিজোদের সাথে। এজন্য তিনি মিজোদের সাতে সখ্যতা গড়ে তুলেন এবং এই কারনে তাঁর রচিত বই-পত্তর মিজোরামে পাওয়া যায়, বিশেষত, রাজধানী আইজলে। বই খুঁজতে গিয়ে আমি সেখানে এমন এক মানুষের সন্ধান পেলাম যিনি একসময় সাজেকের বর্তমান ট্যুরিজম এলাকায় মৌজা প্রধান তথা হেডম্যান ছিলেন। তাঁর নাম মি. লালদোভা। জাতিতে লুসেই বা পাংখোয়া। একসময় পার্বত্য রাঙ্গামাটি স্থানীয় জেলা পরিষদেরও সদস্য ছিলেন। নব্বই দশকের মাঝামঝিতে তিনি ওপারে মিজোরামের দিকে পরিবার পরিজন নিয়ে পাড়ি জমান। তিনি আমাকে তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরী থেকে তাঁর বাবা আমলের একটি স্যুভেনির ইমেজ বের করে দেখিয়েছেন। সেটা ছিলো বৃটিশ রাজ কর্তৃক দেয়া মৌজা প্রধান বা হেডম্যানশিপের মেডেল। অর্থাৎ তাঁর বাবার সূত্র ধরেই তিনিও হেডম্যানশিপ পেয়েছিলেন।
পরে তাঁর মারফত আরো কয়েকজন পাংখোয়া ও লুসেই জনজাতির সন্ধান আমি সেখানে পাই যার মধ্যে একজন ছিলো আমার হাইস্কুল জীবনের একবছরের বড় ভাই। আমার সাথে একই স্কুলেই তিনি লেখাপড়া করেছেন, নাম: চন্দ্রঘোনা মিশন হাইস্কুল (বর্তমান নাম পাহাড়িকা হাই স্কুল)। তাঁদের বাড়ীও ছিলো সাজেকে। তাঁরাও আত্নীয় স্বজন নিয়ে এখন সেখানে পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের বর্ণনা থেকে শুনেছি তারা অনেক প্রতিপত্তি নিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সাজেক এলাকায় বসবাস করে আসলেও শেষ পর্যন্ত মাতৃভুমি ছেড়েছে। প্রশ্ন হলো কি পরিমাণ অবস্থায় পড়লে মানুষ নিজের মাতৃভুমি ছাড়ে? এ বিষয়গুলো কি আমাদের রাষ্ট্র কখনো জানার চেষ্টা করেছে? নাকি রাষ্ট্র এটা জেনেশুনেই এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সায় দিচ্ছে?
এতটুকু ভরসা
ট্যুরিজম হয়তো গোটা রাষ্ট্রের একটি উন্নয়ন খাত। কিন্তু জোর করে কি উন্নয়ন হয়? কোখায় শুনেছেন স্থানীয়দের বঞ্চিত করে ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠা করতে? খুব বেশী দুরে তাকাতে হবেনা। পাশের দেশ ভারত-ভুটানে দেখুন। ভূটানে স্থানীয় গাইড ছাড়া কোনো বিদেশীই ভ্রমণ করতে পারেনা যদি না সেটা সরকারি ট্যুর হয়। উন্নয়নের জন্য ট্যুরিজম যুতসই তখনিই হবে যখন স্থানীয়দের মতামতকে আমলে নেবে, তাঁদের বঞ্চিত না করবে, তাঁদেরকে ব্যবস্থাপনা ও নায্য হিস্যায় যুক্ত করা হবে। এটাও মনে রাখতে হবে স্থানীয় মানুষই সংশ্লিষ্ট এলাকা ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর সব সময় নিজের সন্তানের মতো মায়া রাখে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, মানুষের জীবন রীতি অগ্রাহ্য করে যে উদ্যোগই নিক না কেন, গায়ের জোরে একদিন হয়তো সম্ভব কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এই খাতকে যুতসই করতে হলে প্রকৃতি আর স্থানীয় মানুষের উপকার হয় এমন পরিকল্পনাতে ফিরে আসতেই হবে। ভরসার কথা একারনেই বললাম, উপরে যে দুজন মানুষের নাম উল্লেখ করলাম, যেমন মি অপু নজরুল বা শাহাওনুল হক, এঁদের মতন অনেক প্রকৃতিপ্রেমী, পাহাড় বান্ধব ও প্রগতিশীল ভ্রমণকারী তথা মানুষ আছে এদেশে। তাঁরা যদি এসব ইস্যু মিটিগেশানে এগিয়ে আসেন তবে পাহাড়ের পর্যটন সংশ্লিষ্ট অনেক নিরাশার মাঝেও আলোর মুখ পাওয়া যাবে। এখানে একা পাহাড়ীরা ফলপ্রসু কিছু করতে পারবে বলে মনে হয়না। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাহাড়ী মাত্রই যে প্রকৃতি প্রেমী, গণবান্ধব ট্যুরিজমে বিশ্বাস করে এমনটা কিন্তু নয়। অপরদিকে এটাও মনে রাখতে হবে, সমতলী মাত্রই যে প্রকৃতি বিরোধী, গণবান্ধব ট্যুরিজম বিরোধী এমনটা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমতলের প্রগতিশীল মানুষজনও গণবান্ধব ট্যুরিজমের জন্য ভোকাল হয়। ‍সুতরাং, এরূপ সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আমরা যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি বা মন্তব্য বা পোষ্ট করবো, একটু ভেবে নিতে হবে যাতে সার্বিক সংবেদনশীলতা রক্ষা হয়। জাতিগত ইস্যু যাতে সেখানে স্থান না করে নেয়। শেষান্তে আমি আমার সমতলীয় বন্ধু ও পাঠকদের একটা অনুরোধ করতে চাই। আমাদের পাহাড়ীরা সম্ভবত জিনগত ভাবে একটু বেশীই ইমোশানাল। অধিকারের কথা বলতে বলতে আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত ধোলাই হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক সময় সংযত আচরণ করাটা আয়ত্বের বাইরে চলে যায়। দীর্ঘদিন এখানে রাজনীতির মারপ্যাঁচে মানুষের প্রকৃত দেশপ্রেমকে নিয়ে প্রশ্ন উঠে পাহাড়ীদের বিপক্ষে। আমি হলফ করে বলতে পারি, পাহাড়ীরাও লাল-সবুজের পতাকাকে সমানভাবে বুকে লালন করে। এদেশ গড়ার পেছনে অনেক পাহাড়ী জাতির রক্তও আছে, পরিমাণে হয়তো কম, চেতনায় নয়। আমি জানি শেষান্তে এসে আমার লেখাগুলো একটু আবেগী হয়ে যাচ্ছে, তবুও আমি এই আবেগকে আপনাদের সবার সাথে ভাগাভাগি করতে চাই। পাহাড়ে উন্নয়ন বলুন, ট্যুরিজম বলুন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া পজেটিভ বা নেগেটিভ কোনোকিছুই সম্ভব নয়। রাষ্ট্র তথা রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণীকে নিশ্চিত করতে হবে যেন ছোট ছোট এই প্রকৃতি নির্ভর মানুষগুলোর আস্থা যাতে অতুট থাকে। পাহাড়ে প্রত্যেক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে সবসময় রাজনীতির গন্ধ খোঁজা আজকাল ব্যারামে পরিণত হয়েছে। এই গন্ডি থেকে দ্রুত রেড়িয়ে আসতে পারাটাই সবার জন্য মঙ্গলজনক।
পাহাড় বা সমতলে, যেখানেই হোক পরিবেশ বান্ধব, গণবান্ধব ট্যুরিজম নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। বিষয়টা মাথায় রেখে সাজেকের রুইলুই ও কংলাকের ট্যুরিজম ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানো জরুরী। ইতিমধ্যে স্থানীয় মানুষের জীবন প্রণালী ও সংস্কৃতি যতটুকু ধ্বংস হয়েছে সেটা হয়তো আর ফিরে আনা সম্ভব নয়। এটাও মনে রাখতে হবে, ঐ এলাকার আদিবাসী কমিউনিটি ঐরূপ চিড়িয়াখানাধর্মী পরিবেশে কোনোভাবেই টিকতে পারবেনা। কম্পেন্সেটরী হিসেবে টোটাল প্রজেক্টের ব্যবস্থাপনা ও রেভিন্যু’র নায্য হিস্যা নিশ্চিতের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাবাসীকে সংযুক্ত করা জরুরী। এমন প্রস্তাবনা তুলে ধরার জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ ও গরীব মানুষজনের সক্ষমতা হয়তো থাকবেনা। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর আঞ্চলিক নেতারা সেনা কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ ও আলোচনা করা প্রয়াস চালানোটাই হবে সঙ্গত। সেক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। সম-ব্যবস্থাপনা ও নায্যহিস্যা যখন ঠিক হয়ে যাবে তখন সমাধি অবহেলার মতন অন্যান্য ইস্যুগুলোও দেখবেন ফিক্স হয়ে গেছে। যেটা দরকার হলো শুধু আন্তরিকতা। আমি ছোটো মানুষ। লেখাটি বড়কত্তাদের চোখে পড়ার মতো নেটওয়ার্ক আমার নেই। তবুও কথাগুলো বললাম হয়তো কারো না কারোর মাধ্যমে যদি তাঁদের কাছে বার্তাটি পৌঁছে, এই যা। কেজানে, চোখে পড়লে প্রস্তাবনাগুলো তাঁদের চিন্তার খোরাক হলেও হয়তো হতে পারে!
# কংচাই, উন্নয়ন কর্মী ও সাবেক ছাত্রনেতা