Published On: শনি, ডিসে ১৬, ২০১৭

উগ্র জাত্যাভিমান ও সাম্প্রদায়িকতাই পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে অন্যতম বাধাঃ জুয়েল চাকমা

Share This
Tags

পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশে আজ কালো মেঘের ঘনঘটা। বিভীষিকাময় জীবন অতিবাহিত করছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ। দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের তথা পূর্ব বাংলার মানুষকে যেভাবে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এক অলিখিত সামরিক কায়দায় শাসন করত ঠিক তেমনি আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে সেই পাকিস্তানী কায়দায় বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী শাসন করছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই পার্বত্য চট্টগামের জুম্ম জনগণ আশায় বুক বেঁধেছিল এবার বুঝি তারা তাদের স্বশাসন নিয়ে জীবন পরিচালনা করবে। কিন্তু বাঙালি জাত্যভিমান, উগ্র মৌলবাদী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির নিকট জুম্ম জনগণের অধিকার মুখ থুবড়ে পড়েছে বারংবার। যার ফলশ্রুতিতে জুম্ম জনগণকে তাদের অধিকার নিয়ে ভাবতে হয়েছে এবং সরকারকেও ভাবতে বাধ্য করেছে। যদিও দেশের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী জুম্ম জনগণের আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে অন্যদিকে ধাবিত করার চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রকে জুম্ম জনগণ নস্যাৎ করতে সফল হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের অধীনে স্বশাসনে বিশ্বাস করে, এদেশকে ভালবাসে ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়, এদেশের একজন নাগরিক হয়ে সম্মানের সাথে বাস করতে চায় তা প্রমাণ করেছে চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে। এই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কোনো একদিন বা একটি আলোচনার মধ্য দিয়ে স্বাক্ষরিত হয়নি। এই চুক্তি স্বাক্ষর হতে সময় লেগেছে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম।

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকারের সনদ। দীর্ঘ ২৬ বার বিভিন্ন সরকারের সাথে আনুষ্ঠানিক সংলাপ অনুষ্ঠিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। লিখিত চুক্তির বাইরেও সরকারের সাথে অলিখিত চুক্তিও হয়েছে বলে আমরা জানতে পারি। ইতিহাসে, এমনকি দৈনন্দিন রাজনৈতিক জীবনে এধরনের অলিখিত চুক্তি হয়ে থাকে। পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক জনসংহতি সমিতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য রক্ষা করেছে এবং করে চলেছে। কিন্তু সে চুক্তিকে আজ সরকার বাস্তবায়ন না করে জুম্ম জনগণের বিশ্বাসকে প্রতিনিয়ত বুটের তলায় পিষ্ট করে চলেছে। সরকার একদিকে চুক্তি বাস্তবায়ন তো করছেই না, অন্যদিকে চুক্তির চেতনা পরিপন্থী বিভিন্ন কার্যক্রম যেমন উন্নয়ন দোহাই দিয়ে সীমান্ত ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ ইত্যাদি বাস্তবায়ন করে চলেছে। এছাড়াও সেনা ক্যাম্প সম্প্রসারণ, পর্যটনের নামে ভূমি বেদখল, প্রভাবশালীদের কর্তৃক ভূমি বেদখল, হত্যা, গুম, ধর্ষণ, বহিরাগতদের অবৈধভাবে হাজার হাজার একর ভূমি ইজারা প্রদান ইত্যাদি অব্যাহতভাবে চলছে।

গত ২ ডিসেম্বর ২০১৭ পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের ২০ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলো। ২০ বছরেও চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি, চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক বলেও জনগণ বিশ্বাস করে না। তারপরও নিভু নিভু হলেও সেই বিশ্বাস আমরা রাখতে চাই। কিন্তু সরকারের যে কার্যকলাপ এবং চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্যতম পক্ষ পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সাথে যে বৈরী আচরণ করছে যার ফলে অবশিষ্ট বিশ্বাস ও আশাটুকু বজায় থাকে কিনা আমি সন্দিহান। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যারা সবচেয়ে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেছিল তারা আজ চুক্তির সম্পূর্ণ বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেক আস্থা এবং বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সেটি আজ সরকার বাস্তবায়ন করতে চাইছে না বলে সাধারণ জনগণের নিকট যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে তা কিন্তু অমনিতেই সৃষ্টি হয়নি। চুক্তি স্বাক্ষরকালে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল সেই আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে, ফেইসবুকে ও ইনস্টাগ্রামে, বিভিন্ন টকশোতে বক্তব্য ও মন্তব্য; চুক্তি স্বাক্ষরের সময় যারা সবচেয়ে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেছিল সেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নানামুখী ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা ও আচার-আচরণে, সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সে চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা বাস্তবায়ন, ১৫টি আংশিক বাস্তবায়ন এবং বাকী ৯টি ধারাসহ অতিশীগ্রই বাস্তবায়ন করা হবে বলে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন সম্পর্কে যে মিথ্যাচার করা হয়েছে সেগুলো আজ চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে সন্দেহ আরো অনেক বৃদ্ধি করেছে।

ফিরোজা বেগম চিনু যার ফেইসবুক আইডি JF Anwar Chinu, যিনি ক্ষমতাসীন দলের মহান জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য। তিনি তাঁর ফেইসবুকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের মাননীয় চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) সম্বন্ধে যখন স্ট্যাটাসে লেখেন “সন্তুবাবু রাঙ্গামাটির ভোটার না। তাঁকে রাঙ্গামাটি থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হোক। প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে, নতুবা ভালো হবে না” এবং “একটা দুইটা জেএসএস/পিসিপি ধর, সকাল বিকাল নাস্তা কর” তখন চুক্তি স্বাক্ষরকারী দলের লোকদের যে সাম্প্রদায়িক মন-মানসিকতা তা সহজে ফুটে উঠে।

গত ২ ডিসেম্বর ২০১৭ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিউজ২৪-এ ‘জনতন্ত্র গণতন্ত্র’ নামে একটি টকশো অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল, চাকমা সার্কেল চীফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন এবং মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) জিল্লুর রহমান। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করানোর জন্য উপরিমহল থেকে চাপ দেয়া হয়েছিল বলে রাজা সাহেব তাঁর টাইমলাইনে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাদের যাদের মধ্যে একজন চুক্তি স্বাক্ষরকালীন ও চুক্তি স্বাক্ষরের পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। তাদের মন্তব্য ও মতামত আমাকে হতবাক এবং মর্মাহত করেছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন তাঁর বক্তব্যের শুরুতে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে একটি বৈষম্যমূলক চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং সমতল ভূমির বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে বৈষম্য করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি আরো বলেন, ‘চুক্তিতে দুইটি ভোটার লিস্ট যার মধ্যে একটি ভোটার লিস্ট করা হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্যে আর অন্যটা পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্যে পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্যে যারা ভোটার হবে তাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা বা নাগরিক হতে হবে। স্থায়ী বাসিন্দা বা নাগরিক কারা হবে? যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির মালিক তারা। এর ফলে নাকি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বহিরাগত বাঙালিরা রয়েছে তারা এখানে ১৯৪০ সালের আগে ও পরে পুনর্বাসন করা হয়েছে এবং জিয়াউর রহমানের আমলে যেটি করা হয়েছে সেটি একটি অংশ মাত্র। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের যে ভূমি সমস্যা সেটি সমাধান করার জন্যে বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলের জনগণের জন্যে যে আইনটা প্রযোজ্য সেটি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু জলভূমি, বনভূমি এবং সরকারী ভূমি এই তিনটাকে আওতার বাইরে রাখতে হবে।’ এছাড়াও তিনি রাজা দেবাশীষ রায় যদি ঢাকায় জমি কিনতে পারেন তাহলে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি কিনতে পারবেন না কেন এই জাতীয় প্রশ্ন ছুড়ে দেন।

আরেক সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জিল্লুর রহমান বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি একটি প্রশংসিত চুক্তি। আমাদের সংবিধানে ১৪৩ আর্টিকেলে কোথাও প্রি-কন্ডিশন দেওয়া নেই যে কাউকে ভোটার হতে হলে নির্দিষ্ট ভূমির মালিক হতে হবে। কিন্তু এখানে চুক্তিতে যে টার্ম এন্ড কন্ডিশনে দেয়া হয়েছে সেখানে একটি বৈষম্যমূলক কথা বলা হয়েছে যে, স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার জন্যে সেখানে একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা থাকতে হবে এবং সেটি সার্কেল চীফ সার্টিফাই করবে। এছাড়াও সংবিধানে ১৪৩ আর্টিকেলে বলা আছে যে, সরকার যে কোন নাগরিকের সম্পত্তির সবকিছু এ্যাকোয়ার এবং ট্রান্সফার করতে পারবে যার অটোরিথি সরকারের আছে। কিন্তু চুক্তিতে বলা আছে, আঞ্চলিক পরিষদের অনুমতি ছাড়া কোনো জমি সরকার এ্যাকোয়ার করতে পারবে না, যা সরাসরি মূল সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তাছাড়া তিনি চুক্তির মাধ্যমে পরস্পরের মাঝে যে অবিশ্বাস ও ঘৃণা তা মেটানোর জন্যে যে লক্ষ্য সেটি চুক্তিতে দেখতে পাননি বলে দাবি করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে নিয়ে তাদের যে পর্যালোচনা যতবার শুনি ততবার বিস্মিত হই। আমি মনে করেছিলাম, চুক্তি হয়েছে কিন্তু ২০ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি এবং কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা হবে ও সরকারকে একটি গঠনমূলক পরামর্শ প্রদান করা হবে। কিন্তু চুক্তির এতবছর পর রাজা বাবুর সূত্র ধরে বলতে হয়, আমাদের চুক্তি করাটা কি ভুল ছিল? তা নিয়ে চিন্তাভাবনা আগে করতে হবে। ওনারা সংবিধানের ১৪৩ আর্টিকেলের কথা উল্লেখ করেন কিন্তু সংবিধানে ২৮(৪) অনুচ্ছেদে “নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যেকোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না” এই ধারাটির কথা উল্লেখ করেন না। তারা এটা জানেন না বা বোঝেন না আমি সেটা মনে করি না। আমি মনে করি, রাষ্ট্রের মধ্যে যে বাঙালি জাত্যভিমান, উগ্র মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের যে চিন্তা তা ওনাদের মাধ্যমে জানান দেয়ার চেষ্টা করছে। তাদের কথা শুনলে মনে হয় চুক্তি করার সময় সরকার সংবিধান না পড়ে চুক্তি করেছে।

ব্যারিস্টার সারোয়ার সাহেব যিনি আইনের একজন পন্ডিত বলতে পারি যেহেতু তিনি ব্যারিস্টার কিন্তু তিনিও দেখি সংসদ নির্বাচন, জেলা পরিষদ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে এক করে দেখছেন। তিনি রাজা বাবুকে জমি কিনতে পারা বা না পারা বিষয়ে যে প্রশ্নটি করেছেন সেটি বিষয়ে যদি বলি- আমরা বাংলাদেশের নাগরিক (পাহাড়ি ও বাঙালি) সবাই কানাডায় গিয়ে নাগরিকত্ব ও জমি কিনতে পারি কিন্তু কানাডার কোন নাগরিককে বাংলাদেশে জমি কেনার তো দূরের কথা নাগরিকত্বও দিতে পারি না। তাহলে আমরা ধরে নেব সরকার তাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে? আমরা কেন এই সমঅধিকার, ন্যায্য অধিকার এবং অগ্রাধিকার বিষয়গুলোকে একই পাল্লায় পরিমাপ করছি? আমরা যদি তাদেরকে সে অধিকার দিই তাহলে কানাডার কয়েকজন ব্যাবসায়ী এই বাংলাদেশকে কিনে ফেলতে পারবে। এর ফলে এদেশের জনগণের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, সামাজিক ইত্যাদির উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং এদেশের জনগণের নিশ্চিহ্ন হওয়ার একটি বাস্তবতা দেখা দিবে। কিন্তু আমাদের দ্বারা তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে কোন বিরূপ প্রভাব পড়ার কোন আশংকা নেই। আমাদের সে রকম সক্ষমতাও নেই। ঠিক তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের দ্বারা বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হওয়ার কোন আশংকা নেই কিন্তু বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে।

সেজন্যে দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্যে, তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বজায় রাখার জন্যে সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়, যার উদাহরণ আমরা পার্শবর্তী দেশ ভারত, নেপালসহ অন্যান্য দেশ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রতে সে ব্যবস্থা দেখতে পাই। কিন্তু তাদের এই আলোচনায় আমি মনেকরি বহু জাতির, বহু সংস্কৃতির এবং বহু ভাষার যে বাংলাদেশ সেটি যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। ওনারা স্বীকার করেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১%। কিন্তু এই কয়েক লাখ পাহাড়িদের রক্ষা করার জন্যে যে ব্যবস্থা সে ব্যবস্থাকে তারা বাঙালিদের সাথে বৈষম্য করা হচ্ছে বলে প্রতিবাদ করেন। এই হচ্ছে বাস্তবতা।

তাছাড়া সারোয়ার সাহেব যে সেখানকার বাঙালিদের নাকি ৪০ দশকের আগে থেকে পুনর্বাসন করা হয়েছে বলে যে মন্তব্য করেছেন তা সরাসরি মিথ্যাচার করেছেন। বিশেষ উদ্দেশ্যে পুনর্বাসন এবং ন্যাচারেল অভিবাসন দুটি এক জিনিস নয়। ৪০ দশকের আগে এবং ৫০ ও ৬০ দশকে যে বাঙালিরা সেখানে গেছে তারা মূলত স্বেচ্ছায় কেউ ব্যবসার কারণে, কেউ কৃষিকাজে সাহায্য করার জন্য বসতি স্থাপন করেছিল যা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের মাত্র ২ শতাংশ। কিন্তু যারা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারি উদ্যোগে তাদেরকে নেয়া হয়েছে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। পাহাড়িদের সংখ্যালঘু ও জনমিতি পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে নানা সহায়তা ও নিয়মিত রেশন দিয়ে সমতলের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাষ্ট্রীয় প্রত্যক্ষ মদদে তাদেরকে পার্বত্য অঞ্চলে বসতি প্রদান করা হয়। এই সত্যকে তারা আজ বুঝেও না বোঝার ভান করেন। সেটেলারদের যদি এখান থেকে তাদের জায়গায় তাদেরকে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করা হয়, আমি মনেকরি তারা স্বেচ্ছায় চলে যাবে। এজন্য সরকারেরই উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু সরকার চুক্তির ২০ বছরেও এই ধরনের কোন উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত গ্রহণ করেনি যদিও সরকারকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছিল।
এছাড়াও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না করে (যে চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সত্যিকারের শান্তি নিহিত আছে) সরকার এবং সরকারের মদদপুষ্ট আমলারা শুধুমাত্র উন্নয়ন উন্নয়ন বলে মুখে ফেনা তুলছেন। তারা বলতে চান যে, যেখানে আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকা রাস্তা ছিল ৪৮ কিলোমিটার বর্তমানে ১৫৩৫ কিলোমিটার, আগে হসপিটাল ছিল ৩টি বর্তমানে ২৫টি, আগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল ছিল ১১টি বর্তমানে ৪৭৯টি এবং আগে উন্নয়ন বোর্ডের বাজেট ছিল ৫০ কোটি বর্তমানে ৯১৫ কোটি। এই হলো তাদের চুক্তি বাস্তবায়নের ফিরিস্তি। কিন্তু চুক্তি শুধুমাত্র অবকাঠামো তৈরি করার জন্য করা হয়নি, চুক্তি করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণসহ পার্বত্যবাসীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে।

পক্ষান্তরে আমরা দেখি চুক্তি পরবর্তী ২০০৭-২০১৬ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪৯২ জন আদিবাসী পাহাড়ি নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয় যার মধ্যে ধর্ষণ করা হয় ১৩৫ জনকে, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৪৪ জনকে, শারীরিক নির্যাতন করা হয় ১৫১ জনকে, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় ৯০ জনকে, অপহরণ করা হয় ৩৭ জনকে, যৌন হয়রানি করা হয় ২৫ জনকে এবং পাচার করা হয় ১০ জনকে, যার বিচার এখনো জুম্ম জনগণ পায়নি। আদিবাসীদের নিকট থেকে সর্বমোট ১৬০৫টি রাবার প্লট ও হর্টিকালচার প্লট এর বিপরীতে প্লট প্রতি ২৫ একর করে ৪০,০৭৭ একর জমি ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে বেদখল করা হয়েছে যেগুলো ছিল জুম্মদের সমষ্টিগত মালিকানাধীন জুমভূমি ও মৌজাভূমি। বিজিবি ক্যাম্প সম্প্রসারণ ও সেনা আর্টিলারি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করার নামে সর্বমোট ৭১,৮৭৭.৪৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। পর্যটনের কারণে হাজার হাজার একর জায়গা বেদখল ও অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। তারা স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে পড়ছে। তারা দিন দিন সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে। অনেকে দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত তাদের বঞ্চনা এবং অপমানের জীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে।
পরিশেষে বলতে চাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক মিথ্যাচার হয়েছে। জুম্ম জনগণ আজ চুক্তির পর ২০ বছর ধরে ব না ও অপমানের সাথে জীবন নির্বাহ করছে। চুক্তি বাস্তবায়ন হবে বা হচ্ছে কথায় আশায় আশায় বুক বেঁধেছে। কিন্তু আর না। সরকারকে মাথায় রাখতে হবে অপমানের প্রতিক্রিয়া শুধুমাত্র চোখের জল নয়, বিদ্রোহেও হতে পারে, যা কারোর জন্য সুখকর হয় না।

জুয়েল চাকমা: সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি।

About the Author

অধ্যাপক অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে আরেকটি খোলা চিঠি অনিয়মের প্রতিবাদে অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে আইনজীবীরা আনিসুজ্জামানের কমরেড কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডলের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন কাছে আরেকটি খোলা চিঠি খাগড়াছড়িতে খাগড়াছড়িতে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের প্রতিবাদে জনপ্রতিনিধিদের সংবাদ সম্মেলন খোলা চিঠি চীবর দানোৎসব শুরু ছুটিতে জনপ্রতিনিধিদের সংবাদ সম্মেলন জসিম উদ্দিন জসিম উদ্দিন মণ্ডলের প্রতি জ্যেষ্ঠ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা উদ্বিগ্নঃ প্রধান বিচারপতির ছুটিতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান কঠিন চীবর দান পাহাড়ে পাহাড়ে মাসব্যাপী কঠিন চীবর দানোৎসব শুরু পিসিপি’র রাঙ্গামাটি পিসিপি’র রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ শাখার ২১তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল সম্পন্ন প্রধান বিচারপতি ছুটিতে বান্দরবানের বান্দরবানের রোহিঙ্গাদের বালুখালীতে স্থানান্তর শুরু বালুখালীতে বিচারপতি বৌদ্ধদের অন্যতম মাসব্যাপী কঠিন রোহিঙ্গাদের শিক্ষক নিয়োগে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের শেষ শ্রদ্ধা শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন শ্রদ্ধা নিবেদন সংবাদ সম্মেলন সম্মেলন ও কাউন্সিল সম্পন্ন সরকারি কলেজ শাখার স্থানান্তর শুরু ২১তম ২১তম বার্ষিক শাখা
উপরে